প্রকাশিত: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪৩ এএম
1759
০১ মে ২০২৬, ০৮:৪০ এএম
মক্কার কাবা শরিফ
মানুষের জীবনে কিছু কিছু যাত্রা থাকে, যা কেবল পথ অতিক্রম নয় বরং আত্মার গভীরে পৌঁছানোর এক অনন্য সাধনা। পবিত্র হজ্ব তেমনই এক মহাযাত্রা।
এটি কোনো সাধারণ সফর নয়, এটি এক আত্মশুদ্ধির আহ্বান, যেখানে মানুষ নিজেকে সমর্পণ করে তার স্রষ্টার কাছে, সমস্ত অহংকার, ভেদাভেদ ও পার্থিব পরিচয় ভুলে।
প্রতি বছর পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ ছুটে আসে কাবা শরীফ-এর পানে। ভাষা আলাদা, বর্ণ আলাদা, সংস্কৃতি আলাদা কিন্তু উদ্দেশ্য এক, হৃদয়ের আহ্বান এক;
“লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক” হে প্রভু, আমি হাজির।
হজ: সাম্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি
হজের প্রথম দৃশ্যই যেন এক অপূর্ব শিক্ষা। ইহরামের সাদা কাপড়ে আবৃত লাখো মানুষ কেউ রাজা নয়, কেউ ভিখারি নয়; সবাই এক সারিতে, এক পরিচয়ে বান্দা। এই সাদা পোশাক যেন স্মরণ করিয়ে দেয় মানুষের শেষ ঠিকানার কথা যেখানে সব পরিচয় মুছে যায়, থাকে শুধু কর্ম আর বিশ্বাস।
এখানে কোনো বাহ্যিক জৌলুসের স্থান নেই, নেই কোনো শ্রেণিগত অহংকার। এই সমতা, এই বিনয়—হজ্বের প্রথম পাঠ।
হজ্বের ধারাবাহিক কর্মপদ্ধতি: প্রতিটি ধাপে এক একটি ইতিহাস-
ইহরাম: আত্মসংযমের সূচনা
মীকাত থেকে ইহরাম গ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় হজ্বের আনুষ্ঠানিকতা। এই মুহূর্তে মানুষ নিজের ভেতরের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে এক নীরব অঙ্গীকার করে—সংযম, ধৈর্য ও শুদ্ধতার।
তাওয়াফ: ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দুতে আবর্তন
কাবা শরীফকে কেন্দ্র করে সাতবার প্রদক্ষিণ, এ যেন হৃদয়ের সব আকর্ষণ এক বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত হওয়া। মানুষের জীবনও যেন এই তাওয়াফের মতো শেষ পর্যন্ত তার রবের দিকেই প্রত্যাবর্তন।
সাঈ: সংগ্রাম ও ভরসার প্রতীক
সাফা পাহাড় ও মারওয়া পাহাড়-এর মাঝে চলা কেবল একটি আচার নয়; এটি হযরত হাজেরা (আ.)-এর অটল বিশ্বাস ও সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। এখানে শেখা যায় প্রচেষ্টা ও তাওয়াক্কুল একসাথে চললে রহমতের দরজা খুলে যায়।
মিনা: নীরব প্রস্তুতির দিন
৮ জিলহজ্জে হাজীরা মিনা-তে অবস্থান করেন। এটি যেন আত্মার প্রস্তুতির এক নীরব অধ্যায়—ঝড়ের আগে শান্তির মতো।
আরাফাত: আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত মুহূর্ত
৯ জিলহজ্জে আরাফাত-এ অবস্থান হজের মূল স্তম্ভ। এখানে দাঁড়িয়ে মানুষ তার জীবনের হিসাব মেলে ধরে, অশ্রুসিক্ত দোয়ায় ক্ষমা প্রার্থনা করে। এই দিন যেন কিয়ামতের দিনের এক ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি।
মুযদালিফা: সরলতার এক রাত
মুযদালিফা-র খোলা প্রান্তরে রাতযাপন মানুষকে শেখায় জীবনের আসল সৌন্দর্য সরলতায়, বিলাসিতায় নয়।
রমি: মন্দের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ
জামারাত-এ শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করা আসলে মানুষের অন্তরের অশুভ প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার প্রতীক।
কোরবানি: ত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত
হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর স্মৃতিতে কোরবানি মানুষকে শেখায়—আল্লাহর পথে প্রিয়তম জিনিস ত্যাগ করতেও প্রস্তুত থাকতে হয়।
তাওয়াফে ইফাদা ও বিদায়
শেষে আবার কাবার দিকে ফিরে আসা এবং বিদায়ী তাওয়াফ এ যেন এক গভীর আবেগের মুহূর্ত, যেখানে বিদায়ের মধ্যেও ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে থাকে।
মদিনার নিবিড় সান্নিধ্য: প্রেমের পূর্ণতা
হজের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের পর বা আগে অনেক হাজী ছুটে যান মদিনা শরীফ-এর পবিত্র প্রান্তরে। সেখানে রয়েছে মসজিদে নববী যেখানে শায়িত আছেন প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)।
এই অবস্থান কোনো আনুষ্ঠানিক ফরজ না হলেও, এটি ঈমানের এক গভীর অনুধ্যান। অনেকেই বলেন কাবা ইবাদতের কেন্দ্র, আর রাসূল (সা.)-এর ভালোবাসা সেই ইবাদতের প্রাণ।
যিনি কাবার কাবা যাঁকে ভালোবাসলে আল্লাহকে ভালোবাসা হয়, যাঁর মহব্বত ছাড়া আল্লাহর পথে অগ্রসর হওয়া পূর্ণতা পায় না তাঁর দরবারে উপস্থিত হওয়া এক অতল অনুভূতি। মদিনার নীরবতা, মসজিদে নববীর প্রশান্ত পরিবেশ, দরূদ ও সালামের ধ্বনি সব মিলিয়ে হৃদয়কে এক অন্য জগতে নিয়ে যায়।
হজের প্রতিটি মঞ্জিলে যদি সেই প্রিয় নবীর ভালোবাসা হৃদয়ে ধারণ করা যায়, তবে ইবাদত কেবল আনুষ্ঠানিকতা থাকে না; তা হয়ে ওঠে এক জীবন্ত অনুভূতি, এক অন্তর্গত আলো। তখন হজ্বের শিক্ষা হৃদয়ে প্রতিফলিত হয় গভীরভাবে।
হজের অন্তর্নিহিত শিক্ষা
হজ মানুষকে যে শিক্ষা দেয়, তা চিরন্তন
ধৈর্য ও সংযম
ভ্রাতৃত্ব ও সাম্য
আত্মশুদ্ধি ও তওবা
অহংকার পরিহার
আল্লাহর প্রতি পূর্ণ নির্ভরতা
হজ্ব শেষ হয়, কিন্তু তার শিক্ষা থেকে যায় সারাজীবন।
উপসংহার: ফিরে আসা, কিন্তু নতুন হয়ে
যে মানুষ আন্তরিকতার সাথে হজ্ব সম্পন্ন করে, সে আর আগের মানুষ থাকে না। তার অন্তরে জন্ম নেয় নতুন আলো, নতুন উপলব্ধি, নতুন সংযম।
পবিত্র হজ্ব তাই কেবল একটি সফর নয়
এটি এক পুনর্জন্ম,
একটি আত্মার জাগরণ,
একটি হৃদয়ের পরিশুদ্ধি।
ডাঃ খোন্দকার শাহিদুল হক