বৃহস্পতিবার ১৪, মে ২০২৬

১৪ মে ২০২৬, ০৬:০৬ পিএম

নদী-খাল পুনরুদ্ধার: পানি নিরাপত্তা ও টেকসই কৃষির ভবিষ্যৎ পথরেখা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৯ মার্চ ২০২৬, ১২:৩০ পিএম

2079

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি, অর্থনীতি ও কৃষি ব্যবস্থার সঙ্গে পানি ও নদীর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও অবিচ্ছেদ্য। নদী, খাল, বিল, হাওর ও জলাভূমির বিস্তৃত জালিকা এই দেশকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বদ্বীপ হিসেবে পরিচিত করেছে। হাজার বছরের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় হিমালয় থেকে নেমে আসা গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার পলল সঞ্চয়ে এই ভূখণ্ডের সৃষ্টি। ফলে পানি প্রবাহের স্বাভাবিকতা ও জলসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা দেশের কৃষি, উন্নয়ন ও পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশকে নদীমাতৃক দেশ হিসেবে অভিহিত করা হয় যথার্থ কারণেই। নদীর সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মতভেদ থাকলেও সাধারণভাবে প্রায় ৪০৫টি নদীর কথা বলা হয়, আবার অনেক গবেষকের মতে এ সংখ্যা প্রায় ৭০০-এর কাছাকাছি। নদী রক্ষা কমিশনের তথ্যানুযায়ী এই সংখ্যা ১,০০৮টি পর্যন্ত হতে পারে। এই নদীগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে অসংখ্য খাল, যা একসময় পানি নিষ্কাশন, প্রবাহ ও সেচ ব্যবস্থার কার্যকর প্রাকৃতিক অবকাঠামো হিসেবে কাজ করত।

দেশের প্রধান নদীগুলোর মধ্যে পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, তিস্তা, কর্ণফুলী, সুরমা, কুশিয়ারা, ধরলা, দুধকুমার, আত্রাই, মহানন্দা, গোমতি, মুহুরী ও ফেনী উল্লেখযোগ্য। এসব নদী পার্বত্য ও হিমালয় অঞ্চলে উৎপন্ন হয়ে বাংলাদেশ অতিক্রম করে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। এই নদীগুলোর সঙ্গে যুক্ত খালসমূহ গ্রামীণ পানি ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছিল।

অতীতে গ্রামবাংলার খালগুলো নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশনের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা কমানো সম্ভব হতো। আবার শুষ্ক মৌসুমে এই খালগুলোর পানি সেচ, মৎস্য চাষ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। ফলে নদী ও খালের সমন্বিত ব্যবস্থাই ছিল ঐতিহ্যবাহী পানি ব্যবস্থাপনার মূল কাঠামো।

বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থাও এই প্রাকৃতিক পানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করেই বিকশিত হয়েছে। খালের পানি ব্যবহার করে কৃষকরা ধানসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করতেন। একই সঙ্গে খালগুলো ছিল গ্রামীণ যোগাযোগ ও নৌপরিবহনের অন্যতম মাধ্যম।
তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রাকৃতিক নেটওয়ার্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদী দখল, নাব্যতা হ্রাস, অপরিকল্পিত নগরায়ন, জলাভূমি ভরাট, অবৈধ বালু উত্তোলন এবং খাল দখলের ফলে পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। অনেক খাল ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে, আর অনেক খাল কার্যক্ষমতা হারিয়েছে। এর ফলে বর্ষায় বন্যা ও জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট তীব্রতর হচ্ছে।

বর্তমানে কৃষিতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা ক্রমাগত বাড়ছে। গভীর ও অগভীর নলকূপের মাধ্যমে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে অনেক এলাকায় পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই সারফেস ওয়াটার নির্ভর কৃষি ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়া এখন অত্যন্ত জরুরি।

এই বাস্তবতায় নদী ও খাল পুনরুদ্ধার একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে সামনে এসেছে। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং খাল পুনঃখননের মাধ্যমে একটি সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সম্ভব, যা বন্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কৃষি ও পরিবেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে।

বাংলাদেশে খাল খননের উদ্যোগ নতুন নয়। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে পানি নিষ্কাশন ও সেচ উন্নয়নের লক্ষ্যে খাল খনন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ১৯৭৭ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে শুরু হওয়া দেশব্যাপী খাল কাটা কর্মসূচি।

মানিকগঞ্জের হরিরামপুর থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ ছিল গণঅংশগ্রহণভিত্তিক একটি কার্যক্রম, যেখানে স্থানীয় জনগণসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়।
এই কর্মসূচির আওতায় প্রায় ২,০০০ মাইলেরও বেশি খাল খনন ও পুনঃখনন করা হয়। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটও এ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে। গাজীপুর অঞ্চলে কড্ডার নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে নাওজোর এলাকায় একটি খাল খনন করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে কৃষি সেচ ও ধান উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কিন্তু পরবর্তীতে দ্রুত নগরায়ন, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে অনেক খাল বিলুপ্ত হয়ে গেছে। একসময়কার গুরুত্বপূর্ণ পানি প্রবাহ পথগুলো এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না—যা দেশের সামগ্রিক বাস্তবতার প্রতিফলন।

বর্তমান সময়ে আবারও খাল পুনর্জাগরণ কর্মসূচি নতুনভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় নতুন করে খাল খনন কার্যক্রম শুরু হওয়া এ উদ্যোগকে আরও গতিশীল করেছে। এটি দেশের পানি ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠনের একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

খাল পুনর্জাগরণের সুফল বহুমাত্রিক। বর্ষায় পানি দ্রুত নিষ্কাশনের মাধ্যমে বন্যা ও জলাবদ্ধতা হ্রাস পাবে। শুষ্ক মৌসুমে সংরক্ষিত পানি সেচে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে, ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে। পাশাপাশি মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও এই উদ্যোগ সহায়ক হতে পারে।

নীতিগত সুপারিশ-
নদী ও খাল পুনর্জাগরণকে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কৌশল হিসেবে গ্রহণ করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন—

সকল জলাশয়ের একটি সমন্বিত জাতীয় ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি,
নদী ও খাল দখলমুক্ত করতে কঠোর আইন প্রয়োগ,
নিয়মিত ড্রেজিং ও পুনঃখননের জন্য স্থায়ী কর্মপরিকল্পনা,
সারফেস ওয়াটারভিত্তিক সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ,
স্থানীয় জনগণ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিতকরণ।

সবশেষে বলা যায়, নদী ও খাল পুনরুদ্ধার কেবল একটি অবকাঠামোগত উদ্যোগ নয়; এটি দেশের কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য একটি অপরিহার্য কৌশল। সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই উদ্যোগ বাংলাদেশের উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

 ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালক
এলএসটিডি প্রকল্প, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট

Link copied!