বৃহস্পতিবার ১৪, মে ২০২৬

১৪ মে ২০২৬, ০৪:৪৬ পিএম

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দমন-পীড়নের কারণে থেমে যায় ঢাবি ছাত্র তারেক রহমানের শিক্ষাজীবন

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২ মে ২০২৬, ০৭:১৯ পিএম

1719

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের শিক্ষাজীবন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরও কেন তিনি উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করতে পারেননি—এ প্রশ্ন বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক বক্তব্য, টকশো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠে এসেছে। তবে সংশ্লিষ্ট সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং তৎকালীন শিক্ষাঙ্গনের অস্থির পরিস্থিতির কারণে তার শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হয়েছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

মাধ্যমিক সনদ অনুযায়ী, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তারেক রহমানের বয়স ছিল মাত্র তিন বছর। সে সময় মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের পরিবারের সদস্য হিসেবে তার মা বেগম খালেদা জিয়া, ছোট ভাই আরাফাত রহমানসহ তাকেও গ্রেপ্তার হতে হয়েছিল। শৈশব থেকেই রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের অভিজ্ঞতা তার স্বাভাবিক জীবনধারাকে ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি করে।

পরবর্তীতে ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করে ১৯৮৫-৮৬ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন তারেক রহমান। পরে বিভাগ পরিবর্তন করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অধ্যয়ন শুরু করেন। তিনি স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ছিলেন। তবে সে সময় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত অস্থিতিশীল।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ধর্মঘট, সংঘর্ষ এবং দীর্ঘ সেশনজটের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ফলে অনেক শিক্ষার্থীর মতো তারেক রহমানও নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।

১৯৮৬ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় গৃহবন্দিত্ব এড়িয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন তারেক রহমান। পরবর্তীতে তাকে ও তার মা বেগম খালেদা জিয়াকে একাধিকবার গৃহবন্দি করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।

এ সময় তিনি রাজপথের আন্দোলনেও সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ১৯৮৮ সালে গাবতলী উপজেলা ইউনিটের সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপির রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হন। তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও ভূমিকা রাখেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন রাজনৈতিক পরিবেশ সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. হিমাদ্রি শেখর চক্রবর্তী বলেন, ওই সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সেশনজট ছিল ব্যাপক। নির্ধারিত সময়ে ক্লাস ও পরীক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব হতো না। হলগুলোতেও রাজনৈতিক দখলদারিত্ব ও সংঘর্ষের পরিবেশ বিরাজ করত।

ঢাবির আরেক প্রত্যক্ষদর্শী ও কবি জসীমউদ্দীন হলের অফিস সহকারী মামুনুর রাশিদ জানান, সে সময় ক্যাম্পাসে প্রায়ই সংঘর্ষ, গোলাগুলি ও অস্থিরতা দেখা যেত। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনা করতে পারতেন না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম বলেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যই উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করতে পারেননি। তার মতে, তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক বাস্তবতা ও পারিবারিক পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল।

তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি সম্পন্ন না করতে পারা কোনো ব্যক্তির যোগ্যতা বা নেতৃত্বের সক্ষমতার মাপকাঠি হতে পারে না। বাস্তব রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বগুণও একজন রাজনীতিবিদের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

তারেক রহমানের সাবেক শিক্ষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন ব্যাপারী বলেন, সে সময়ের অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশ ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে তারেক রহমানের জন্য নিয়মিতভাবে ক্যাম্পাসে ক্লাস করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। ক্যাম্পাসজুড়ে সংঘর্ষ ও অস্ত্রের প্রভাব শিক্ষার পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের শিক্ষাজীবনকে শুধুমাত্র ডিগ্রি অর্জনের প্রশ্নে মূল্যায়ন না করে, সেই সময়কার রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় দেখা প্রয়োজন।

Link copied!