মঙ্গলবার ২৬, মে ২০২৬

২৬ মে ২০২৬, ০৪:৩৭ পিএম

কাজী নজরুল ইসলাম: বিদ্রোহ, মানবতা ও অনন্ত সুরের কবি

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২২ মে ২০২৬, ০৮:২৫ এএম

1687

বিদ্রোহ কবি কাজী-নজরুল-ইসলাম

এক অসাধারণ জীবনের আলোকবর্তিকা


বাংলা সাহিত্যের আকাশে যে কয়েকটি নক্ষত্র চিরকাল জ্বলজ্বল করে, তাদের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম নিঃসন্দেহে সবচেয়ে উজ্জ্বল ও উত্তাপময়। তিনি শুধু কবি নন, তিনি একটি বিপ্লব, একটি দর্শন, একটি জীবনাদর্শ।

তাঁর কলম যখন কাগজ স্পর্শ করেছে, সেখান থেকে আগুন ঝরেছে; তাঁর গলা যখন সুরে মিলেছে, সেখান থেকে ঝরেছে অমৃত। শোষণের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন বজ্রকণ্ঠ, প্রেমের সামনে ছিলেন কোমল পাপড়ির মতো নরম। এই অসাধারণ দ্বৈততাই তাঁকে করেছে বাংলা সাহিত্যের চিরকালের সম্পদ।


বাংলাদেশ তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদায় ভূষিত করেছে|| এটি শুধু একটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নয়, এটি  কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের দীর্ঘশ্বাসের প্রতিধ্বনি। তিনি এই ভূখণ্ডের মানুষের কথা বলেছেন, তাদের বেদনার ভাষা রচনা করেছেন, তাদের সংগ্রামের গান গেয়েছেন।বাংলাদেশ সংবাদ

জন্ম ও শৈশব: দুঃখের মাটিতে প্রতিভার অঙ্কুর

১৮৯৯ সালের ২৪ মে, বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম নিলেন এক অসাধারণ শিশু। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে কাজী ফকির আহমদ ও জাহেদা খাতুনের ঘরে জন্ম নেওয়া সেই শিশুর নাম রাখা হলো কাজী নজরুল ইসলাম। গ্রামের মানুষ তাঁকে ভালোবেসে ডাকত "দুখু মিয়া"। এই নামটিই যেন তাঁর সমগ্র জীবনের একটি প্রতীক।

মাত্র নয় বছর বয়সে পিতাকে হারালেন। দারিদ্র্য এলো সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। লেটো দলে গান লিখলেন, সুর দিলেন । জীবনের প্রথম পাঠশালা হলো কঠিন বাস্তবতা। রুটির দোকানে কাজ করলেন, মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করলেন। কিন্তু এই দুঃখ তাকে ভাঙেনি বরং তাঁকে গড়েছে। দুঃখের আঁচেই তাঁর কবিতা পাকা হয়েছে, সোনার মতো খাঁটি হয়েছে।

ময়মনসিংহের ত্রিশালে কিছুদিন কাটান সেখানকার প্রকৃতি ও মানুষ তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলে। পরে আসানসোলে এক রুটির দোকানে কাজ নিলেন। কিন্তু প্রতিভা কি চাপা থাকে? সেখান থেকেই কাব্যের আলো ছড়িয়ে পড়তে লাগল।

সৈনিক থেকে বিদ্রোহী কবি:


প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯১৭ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন। করাচিতে থাকাকালীন বাংলা ও আরবি-ফারসি সাহিত্যের সঙ্গে গভীর পরিচয় হলো। যুদ্ধের মাঠে মৃত্যুর কাছাকাছি থেকে উপলব্ধি করলেন জীবনের অসারতা ও মানুষের অসহায়ত্ব। এই অভিজ্ঞতা তাঁর কবিতায় এনে দিল এক অদ্ভুত গভীরতা।

যুদ্ধ শেষে ফিরে এলেন। ১৯২২ সালে প্রকাশিত হলো "বিদ্রোহী" কবিতা, বাংলা সাহিত্যে যেন একটি বজ্রপাত হলো। এই কবিতা পড়ে পুরো উপমহাদেশ কেঁপে উঠল। শোষণের বিরুদ্ধে, পরাধীনতার বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে এত বলিষ্ঠ, এত নির্ভীক উচ্চারণ বাংলা সাহিত্য আগে দেখেনি।

"বল বীর —
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!"

এই ঘোষণা শুধু কবিতার পঙক্তি নয়, এটি একটি জাতির জেগে ওঠার ডাক। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে নজরুলের এই অবস্থান তাঁকে করে তুলল বাংলার তরুণদের প্রিয় কণ্ঠস্বর।

বিদ্রোহ ও কারাবরণ, সংগ্রামের সৈনিক:


নজরুলের সাহিত্যচর্চা কখনো শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর কলম ছিল তাঁর অস্ত্র। ১৯২২ সালে তিনি "ধূমকেতু" পত্রিকা প্রকাশ করলেন। এই পত্রিকায় লিখলেন ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার কথা। এমন সময়ে যখন অনেকে এমন দাবি করার সাহস রাখতেন না।

"আনন্দময়ীর আগমনে" কবিতা প্রকাশের পর ব্রিটিশ সরকার তাঁকে গ্রেফতার করল। বিচারে এক বছরের কারাদণ্ড হলো। কারাগারে বসেও তিনি থামলেন না। অনশন করলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে অনশন ভাঙার আহ্বান জানিয়ে চিঠি লিখলেন। এই দৃশ্য বাংলার সাহিত্য-ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব মুহূর্ত।

কারাগার থেকে বের হয়েও থামলেন না। লিখে যেতে লাগলেন কবিতা, গান, প্রবন্ধ। "ভাঙার গান", "প্রলয়শিখা", "সাম্যবাদী" একের পর এক  বই ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করল। কিন্তু কলম বন্ধ হলো না।Poetry

মানবতার কবি, সকলের জন্য ভালোবাসা

নজরুল শুধু বিদ্রোহের কবি নন, তিনি মানবতার কবি। তাঁর কবিতায় মানুষের প্রতি ভালোবাসা এতটাই গভীর যে, তা কোনো সংকীর্ণ সীমারেখায় আবদ্ধ নয়। হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-অবাঙালি, ধনী-গরিব সবার কথা তিনি বলেছেন। "মানুষ" কবিতায় তিনি লিখলেন —

"গাহি সাম্যের গান -
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান।"

এই সাম্যের দর্শন তাঁর সমগ্র সাহিত্যের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্ম, বর্ণ, জাতি এই সব বিভেদের উপরে মানুষের স্থান। মানুষই সর্বোচ্চ, মানবতাই সর্বোচ্চ ধর্ম।

শ্রমজীবী মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল অকুণ্ঠ। কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক  এই মানুষদের তিনি তাঁর কবিতায় নায়কের আসনে বসিয়েছেন। তাদের ঘামের গল্প, তাদের বঞ্চনার কথা, তাদের সংগ্রামের বয়ান যেন সব তাঁর কবিতায় অমর হয়ে আছে।Books

সাম্যের কবি: শ্রেণিহীন সমাজের স্বপ্নদ্রষ্টা

নজরুল ছিলেন সত্যিকার অর্থেই সাম্যের কবি। সমাজের উঁচু-নিচু ভেদাভেদকে তিনি ঘৃণা করতেন। "সাম্যবাদী" কাব্যগ্রন্থে তিনি সমাজের শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধে সরাসরি কথা বলেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, পৃথিবীর সব সম্পদ সব মানুষের  কোনো একটি গোষ্ঠীর কুক্ষিগত করার অধিকার কারো নেই।

"কুলি-মজুর" কবিতায় তিনি লিখেছেন শ্রমজীবী মানুষের কথা, যাদের রক্ত-ঘামে সভ্যতা গড়ে উঠেছে কিন্তু তারাই থাকে সবচেয়ে বঞ্চিত। জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে, ধনিকশ্রেণির শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর কলম ছিল নিরলস। মার্কসীয় দর্শনের সঙ্গে পরিচয় থাকলেও তিনি কোনো কঠোর মতাদর্শের ছাঁচে নিজেকে ঢালেননি তাঁর সাম্যবাদ ছিল আরও মানবিক, আরও আধ্যাত্মিক।

ধর্মনিরপেক্ষতা ও সুফিবাদ: এক অসাধারণ সমন্বয়

নজরুলের জীবনদর্শনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো তাঁর ধর্মনিরপেক্ষতা ও সুফিবাদের এক অপূর্ব সমন্বয়। বাহ্যত এ দুটি যেন বিপরীতমুখী  কিন্তু নজরুলের কাছে এরা ছিল একই সত্যের দুটি রূপ।

একদিকে তিনি হিন্দু দেবদেবীর স্তুতিতে অপূর্ব গান রচনা করেছেন  শ্যামাসঙ্গীত, কীর্তন, ভজন। অন্যদিকে রচনা করেছেন অসাধারণ সব ইসলামী গান ও কবিতা। এই দুটির মধ্যে তিনি কোনো বিরোধ দেখেননি  কারণ তাঁর কাছে সব ধর্মের মূলে আছে একই সত্য, একই আলো।

সুফিবাদের প্রভাব তাঁর কবিতায় গভীরভাবে প্রোথিত। প্রেম, ভক্তি, আত্মসমর্পণ এই সুফি দর্শন তাঁর গানে ও কবিতায় বারবার ফিরে এসেছে। রুমি, হাফিজ, ওমর খৈয়ামের প্রভাব তাঁর রচনায় স্পষ্ট। কিন্তু তিনি তাঁদের নকল করেননি  বরং সেই ধারাকে বাংলার মাটিতে নতুনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

তাঁর বিখ্যাত গান "আল্লাহ্ মেঘ দে, পানি দে" থেকে শুরু করে "শ্যামা মায়ের চরণ ধুলো" এই দুই ধারায় তিনি সমান দক্ষতায় লিখেছেন। এটি নজরুলের ব্যক্তিত্বের এক বিরল দিক, যা তাঁকে সকল মানুষের কবি করে তুলেছে।

 ইসলামী সাহিত্যে অফুরন্ত অবদান

ইসলামী সাহিত্যে নজরুলের অবদান অতুলনীয়। বাংলা ভাষায় ইসলামের মর্মবাণীকে এমন শিল্পসম্মতভাবে, এমন হৃদয়গ্রাহী ভঙ্গিতে আর কেউ উপস্থাপন করতে পারেননি। তাঁর ইসলামী গান ও কবিতা আজও মুসলমানদের হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।

রমজান মাসে তাঁর রচিত "ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ" গানটি প্রতি বছর কোটি মানুষের মুখে মুখে ফেরে। এই গানটি শুধু একটি গান নয়, এটি বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে গেছে।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে রচিত তাঁর নাত ও গজলগুলো অসাধারণ ভক্তি ও শ্রদ্ধার প্রকাশ। "মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লেআলা", "আল্লাহ্ নামের বীজ বুনেছি", "তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে"  এই গানগুলো বাংলা ইসলামী সংগীতের অমর সম্পদ।

হামদ, নাত, গজল  ইসলামী সংগীতের প্রতিটি ধারায় তিনি অবদান রেখে গেছেন। সংখ্যায় প্রায় পাঁচশোরও বেশি ইসলামী গান রচনা করেছেন তিনি। এই সংখ্যা যেমন বিশাল, এর মানও তেমনি উচ্চ।

গানের জগতে: এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী সুরস্রষ্টা

কবিতায় যেমন, গানেও নজরুল ছিলেন এক বিস্ময়। তিনি শুধু গানের কথা লিখতেন না  সুরও দিতেন। তাঁর গানের পরিমাণ এতটাই বিশাল যে এটি প্রায় অবিশ্বাস্য। চার হাজারেরও বেশি গান রচনা করেছেন তিনি  যা "নজরুলগীতি" বা "নজরুলসংগীত" নামে পরিচিত।

রাগভিত্তিক গান, লোকসংগীত, ভাটিয়ালি, বাউল, কীর্তন, গজল, গজলের ধাঁচে বাংলা গান  সব ধারায় তাঁর সমান দক্ষতা। তিনি হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতকে বাংলার লোকসুরের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করলেন এক নতুন ধারা।

"বাগিচায় বুলবুলি তুই", "ভুলি কেমনে আজও যে মনে", "শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে" এই প্রেমের গানগুলো বাংলার রোমান্টিক সংগীতের সেরা সম্পদ। আবার "কারার ঐ লৌহ-কপাট" গানটি হয়ে উঠেছে মুক্তিকামী মানুষের মন্ত্র।

গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি বাংলা সংগীতকে নিয়ে গেলেন সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে। সেই সময়ে রেকর্ডিং শিল্পকে তিনি এক নতুন মাত্রা দিলেন।

সাহিত্যকর্ম: বহুমুখী প্রতিভার বিচ্ছুরণ:

নজরুলের সাহিত্যকর্ম শুধু কবিতা ও গানে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি লিখেছেন উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, নাটক। প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি রেখে গেছেন তাঁর স্বকীয় ছাপ।

তাঁর প্রধান কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য "অগ্নিবীণা" (১৯২২), "দোলনচাঁপা" (১৯২৩), "বিষের বাঁশি" (১৯২৪), "ভাঙার গান" (১৯২৪), "সিন্ধু-হিন্দোল" (১৯২৭), "সাম্যবাদী" (১৯২৫), "সর্বহারা" (১৯২৬), "ফণী-মনসা" (১৯২৭)। প্রতিটি  গ্রন্থ তার সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার এক জীবন্ত দলিল।E-Books

গল্পগ্রন্থ "ব্যথার দান", "রিক্তের বেদন" এই গল্পগুলোয় মানবজীবনের করুণ দিকগুলো অপূর্বভাবে চিত্রিত। উপন্যাস "বাঁধনহারা" এবং "মৃত্যুক্ষুধা" বাংলা সাহিত্যে তাঁর কথাসাহিত্যিক প্রতিভার স্বাক্ষর।

দুঃখ জয়ের জনক: বেদনাকে শক্তিতে রূপান্তর


নজরুলের জীবন ছিল দুঃখের এক দীর্ঘ পরিভ্রমণ। শৈশবে দারিদ্র্য, যৌবনে কারাবরণ, প্রিয় পুত্র বুলবুলের অকালমৃত্যু, স্ত্রীর অসুস্থতা  একের পর এক আঘাত এসেছে তাঁর জীবনে। কিন্তু প্রতিটি আঘাতকে তিনি শিল্পে রূপান্তরিত করেছেন।

পুত্র বুলবুলের মৃত্যুর পর লিখেছেন অসাধারণ কিছু গান ও কবিতা  যেখানে শোক আছে, কিন্তু হতাশা নেই। তিনি বিশ্বাস করতেন  দুঃখ মানুষকে পরিশুদ্ধ করে, শক্তিশালী করে। এই দর্শনই তাঁকে করেছে দুঃখ জয়ের জনক।

 তিনি নিজেই লিখেছেন —

"বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না।"Books

এই পঙক্তিতে আছে তাঁর সমগ্র জীবনদর্শন  যতদিন অন্যায় আছে, যতদিন বঞ্চনা আছে, ততদিন বিদ্রোহ থাকবে।

ভাবের মানুষ, ভক্তির মানুষ

নজরুল ছিলেন গভীরভাবে আধ্যাত্মিক একজন মানুষ। তাঁর বাহ্যিক বিদ্রোহের আড়ালে ছিল এক গভীর ভক্তিপ্রবণ হৃদয়। ঈশ্বরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল প্রেমিক ও প্রিয়তমার সম্পর্কের মতো কখনো অভিযোগ, কখনো আকুতি, কখনো আত্মসমর্পণ।Poetry

শ্যামাসংগীতে তিনি কালীকে ডেকেছেন মায়ের মতো, প্রিয়ার মতো। ইসলামী গানে আল্লাহকে ডেকেছেন পরম দয়ালু হিসেবে। এই ভক্তি কোনো প্রথাগত ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না  এটি ছিল হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা এক আন্তরিক প্রেম।

তাঁর কবিতায় বারবার এসেছে প্রেমের কথা  ঐশী প্রেম ও মানবিক প্রেম। তাঁর প্রেমের কবিতাগুলো বাংলা সাহিত্যের সেরা প্রেমসাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত। প্রার্থনা, আকুতি ও প্রেম  এই তিনটি তত্ত্ব মিলে তৈরি হয়েছে নজরুলের আধ্যাত্মিক জগৎ।Politics

সমাজ ও মানুষের কল্যাণে অবদান

নজরুল শুধু কাব্যের জগতে নয়, সমাজের কল্যাণেও সরাসরি কাজ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতি সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার।

নারীর অধিকারের প্রশ্নে তিনি ছিলেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে। তাঁর "নারী" কবিতায় তিনি নারীকে পুরুষের সমকক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন  এমন একটি সময়ে যখন নারী-পুরুষের সমতার কথা বলা ছিল সাহসিকতার কাজ। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য তিনি সারাজীবন কাজ করে গেছেন। হিন্দু-মুসলমানের মিলনের জন্য তাঁর কলম কখনো বিশ্রাম নেয়নি।

রোগাক্রান্ত জীবন ও নীরবতার বছরগুলো

১৯৪২ সালে হঠাৎই নজরুল গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এক রহস্যময় রোগে তাঁর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেল, বাকশক্তি চলে গেল। যে কবির কণ্ঠ ছিল বজ্রের মতো উচ্চকিত, সেই কণ্ঠ হঠাৎ নীরব হয়ে গেল। চিকিৎসকরা পরে নির্ণয় করলেন "Pick's disease" নামের এক দুরারোগ্য মস্তিষ্কের ব্যাধি।

দীর্ঘ ৩৪ বছর তিনি এই নীরবতার মধ্যে কাটালেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে সপরিবারে ঢাকায় নিয়ে আসলেন। বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হলো তাঁকে। জাতীয় কবির মর্যাদায় ভূষিত করা হলো।

১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকায় পিজি হাসপাতালে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হলো — তাঁর নিজের ইচ্ছা অনুযায়ীই।

নজরুলের উত্তরাধিকার: যুগে যুগে প্রাসঙ্গিক

নজরুল আজও প্রাসঙ্গিক  এটি তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়। তাঁর জন্মের প্রায় দেড়শো বছর পরেও যখন কোথাও অন্যায় হয়, মানুষ তাঁর কবিতা আবৃত্তি করে। যখন মুক্তিযুদ্ধ হয়, "কারার ঐ লৌহ-কপাট" বাজে। যখন ঈদের চাঁদ ওঠে, তাঁর গান ভেসে আসে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নজরুলের গান ও কবিতা মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণার উৎস ছিল। তাঁর বিদ্রোহী সত্তা, তাঁর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা  সব মিলে মিশে ছিল সেই মহান সংগ্রামে। 

তাঁর সাহিত্যকর্ম আজ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বিশ্বসাহিত্যের মানচিত্রে বাংলা সাহিত্যকে তিনি একটি বিশিষ্ট স্থানে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন।

উপসংহার: চিরজাগ্রত এক কণ্ঠস্বর

কাজী নজরুল ইসলাম শুধু একজন কবি নন  তিনি একটি যুগের প্রতিনিধি, একটি আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। দুঃখী মানুষের কান্না তাঁর কলমকে করেছে তীক্ষ্ণ, শোষিতের বেদনা তাঁর কণ্ঠকে করেছে বজ্রকঠিন। আবার প্রেমের স্পর্শে সেই কণ্ঠই হয়েছে কোমল বাঁশির সুর।

তিনি ছিলেন সদা জাগ্রত  অন্যায়ের বিরুদ্ধে, বঞ্চনার বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। তাঁর হৃদয় ছিল খোলা আকাশের মতো বিশাল,  সেখানে জায়গা ছিল সব মানুষের, সব ধর্মের, সব বর্ণের।

নজরুল প্রমাণ করে গেছেন যে, সত্যিকারের শিল্পী কখনো শুধু নিজের জন্য বাঁচেন না  তিনি বাঁচেন তাঁর মানুষের জন্য। তাঁর কবিতা, তাঁর গান, তাঁর সংগ্রাম  সব কিছুই ছিল মানুষের কল্যাণে নিবেদিত। 

যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, যতদিন মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে, যতদিন মানুষ ভালোবাসবে  ততদিন নজরুল থাকবেন। তাঁর কণ্ঠ নীরব হয়েছিল, কিন্তু তাঁর বাণী চিরকাল সরব থাকবে। এই চিরজাগ্রত কবিকে আমাদের শ্রদ্ধা, আমাদের ভালোবাসা  যুগ থেকে যুগান্তরে।

লেখক: খোন্দকার শাহিদুল হক, কবি ও কলামিস্ট

Link copied!