প্রকাশিত: ২৩ মে ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম
1696
২৫ মে ২০২৬, ০১:৪৭ পিএম
১৫৬টি সংগঠনের যৌথ সংবাদ সম্মেলন ও বক্তব্য প্রদান।
দেশে নারী ও শিশুদের প্রতি ক্রমাগত বাড়তে থাকা জঘন্য সহিংসতা, ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশের ১৫৬টি অধিকারভিত্তিক সংগঠন ও প্ল্যাটফর্ম। উদ্ভূত এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এসব অপরাধকে অবিলম্বে ‘জাতীয় জরুরি ইস্যু’ হিসেবে ঘোষণার পাশাপাশি নারী-শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘জিরো টলারেন্স’ (শূন্য সহনশীলতা) নীতি গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের জোর দাবি জানিয়েছে তারা।
শনিবার (২৩ মে) দুপুরে রাজধানীর আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে দেশের ৬৪ জেলার নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা ১৫৬টি সংগঠন ও প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে এই আহ্বান জানানো হয়। ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ এবং ‘আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট’ সহ দেশের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনসমূহ যৌথভাবে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে সংঘটিত শিশু ধর্ষণ ও হত্যাসহ একাধিক লোমহর্ষক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অপরাধীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত রাখার দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটের প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক। তিনি তাঁর বক্তব্যে প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের ওপর জোর দিয়ে বলেন, "নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো প্রচলিত আইনের বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। এই লক্ষ্যে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের কার্যকারিতা বাড়িয়ে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু কঠোর আইন প্রণয়ন করলেই হবে না; বাস্তবে ভুক্তভোগীদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা, আইনি নিরাপত্তা, আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।" এ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সকল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন, হাইকোর্টের ২০০৯ সালের নির্দেশনার আলোকে স্বাধীন অভিযোগ গ্রহণব্যবস্থা চালু এবং অনলাইন ব্ল্যাকমেইল বা সাইবার সহিংসতা ঠেকাতে বিশেষ সাইবার মনিটরিং ব্যবস্থার দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, দেশে শিশু ধর্ষণ ও সহিংসতা বর্তমানে এক ভয়াবহ ও মহামারি আকার ধারণ করেছে। মূলত বিচারহীনতার সংস্কৃতি, আইনের ফাঁকফোকর এবং সামাজিক অবক্ষয়ের কারণেই অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে এবং নতুন করে অপরাধ করতে সাহস পাচ্ছে। তিনি সরকারের প্রতি শুধু মৌখিক ঘোষণা নয়, বরং কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বাস্তবিক নজির তৈরির আহ্বান জানান। পাশাপাশি সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, শুধু অপরাধী গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশ করলেই হবে না, বরং মামলার চূড়ান্ত পরিণতি ও বিচারপ্রক্রিয়ার নিয়মিত ফলোআপ সংবাদ প্রকাশ করা উচিত।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে চার মাসের একটি ভয়াবহ পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়। সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র চার মাসে দেশের ১৫টি প্রধান গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে ১৭৮ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৫০টিই ছিল দলবদ্ধ বা গণধর্ষণের ঘটনা। ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে ১৪ জনকে। একই সময়ে শিশুদের বিরুদ্ধে ১৯৯টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১১৮টিই শিশু ধর্ষণের ঘটনা এবং ৪৬টি ধর্ষণচেষ্টা।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য দেন সেন্টার ফর ওমেন অ্যান্ড চিল্ড্রেন স্টাডিজের অধ্যাপক ইশরাত শামীম, প্রাগ্রসরের নির্বাহী পরিচালক ফওজিয়া খন্দকার এবং বিএনপিএসের পরিচালক শাহনাজ সুমি। এ সময় কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার একটি মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়নের শিকার এক শিশুর বাবা সশরীরে উপস্থিত হয়ে তাঁর সন্তানের ওপর হওয়া অন্যায়ের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন।