সোমবার ২৫, মে ২০২৬

২৫ মে ২০২৬, ০৩:২৫ পিএম

 নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচারহীনতা বন্ধে বিশেষ মনিটরিং সেলের দাবি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ মে ২০২৬, ০৩:৫১ পিএম

1696

দেশজুড়ে শিশু ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় চলমান বিচারহীনতার সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করতে আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন, দ্রুততম সময়ে ফরেনসিক তদন্ত সম্পন্ন এবং উচ্চ আদালতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন। আজ রবিবার (২৪ মে) দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব) কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের পক্ষে এসব দাবি তুলে ধরেন মানবাধিকারকর্মী ও ফাউন্ডেশনের চেয়ারপার্সন অ্যাডভোকেট এলিনা খান। সংবাদ সম্মেলনে রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই নৃশংস ঘটনা শুধু একটি নির্দিষ্ট পরিবারের নয়, বরং পুরো জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে।

অ্যাডভোকেট এলিনা খান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশে দীর্ঘদিন ধরে শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা জ্যামিতিক হারে বাড়লেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়ার চরম দীর্ঘসূত্রতার কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে এবং আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে। মূলত পুলিশের তদন্তে গাফিলতি, ফরেনসিক ও মেডিকেল রিপোর্ট পেতে অস্বাভাবিক বিলম্ব, মামলা পরিচালনায় ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষার অভাব এবং বিচারিক আদালত শেষে উচ্চ আদালতে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকার কারণে হতদরিদ্র ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অতীতে বহু আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর মামলায় ত্রুটিপূর্ণ তদন্তের কারণে অপরাধীরা আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে খালাস পেয়ে গেছে, যা সাধারণ মানুষের মনে দেশের সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থার প্রতি চরম হতাশা তৈরি করেছে। এই প্রসঙ্গে নিহত শিশু রামিসার অবুঝ বাবার কান্নামাখা একটি বক্তব্য তুলে ধরে এলিনা খান বলেন, সন্তান হারিয়ে ‘আমি আর বিচার চাই না’—একজন অসহায় বাবার মুখে এমন আকুতি রাষ্ট্রের বিচারিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতি নাগরিকদের গভীর অনাস্থারই এক স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। মানুষের মন থেকে হারিয়ে যাওয়া সেই আস্থা ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে রাষ্ট্রকে এখনই সর্বোচ্চ কার্যকরী ভূমিকা নিতে হবে।

বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি থেকে উত্তরণে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে কয়েকটি সুস্পষ্ট ও জরুরি দাবি পেশ করা হয়। প্রথমত, আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং হত্যা মামলার গতিবিধি নজরদারির জন্য বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে, যাতে নিম্ন আদালতে রায়ের পর মামলাগুলো উচ্চ আদালতে অযথা ঝুলে না থাকে এবং রাষ্ট্রপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুত পেপারবুক প্রস্তুত ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি সম্পন্ন করা যায়। পাশাপাশি অসচ্ছল ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অধিকাংশ মামলায় পোস্টমর্টেম, ডিএনএ, ভিসেরা ও কেমিক্যাল ফরেনসিক রিপোর্ট পেতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়, যার সুযোগ নিয়ে আসামিরা জামিনে বেরিয়ে যায় এবং পরবর্তীতে সাক্ষী পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ঘটনার পর সর্বোচ্চ সাত দিনের মধ্যে সুরতহাল, পোস্টমর্টেম ও ডিএনএ সহ যাবতীয় মেডিকেল রিপোর্ট সম্পন্ন করার আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে হবে। যদি নির্ধারিত সময়ে কোনো চিকিৎসক বা কর্মকর্তা রিপোর্ট দিতে ব্যর্থ হন, তবে পাবলিক প্রসিকিউটরের (পিপি) মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা ও চিকিৎসকের কাছে লিখিত জবাবদিহিতা ও কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

সবশেষে, মামলার মূল চালিকাশক্তি সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে একটি সুনির্দিষ্ট ‘সাক্ষী সুরক্ষা আইন’ কার্যকর করার দাবি জানানো হয়। আদালতে সাক্ষীদের বারবার হাজির করে সাক্ষ্য না নিয়ে ফেরত পাঠানোর হয়রানি বন্ধ করতে হবে, স্বল্পতম সময়ের ব্যবধানে শুনানির তারিখ নির্ধারণ করতে হবে এবং উচ্চ আদালতে মামলা পৌঁছানোর পর অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তা নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে। সংবাদ সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে অ্যাডভোকেট এলিনা খান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা ভেঙে অপরাধীদের কাছে রাষ্ট্রকে এই স্পষ্ট ও কঠোর বার্তা দিতে হবে যে—বাংলাদেশে নারী ও শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার পর কোনো অপরাধীই আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে পার পাবে না।

Link copied!