প্রকাশিত: ১৫ জুন ২০২৬, ০৪:০০ পিএম
1693
১৫ জুন ২০২৬, ০৫:৩০ পিএম
শেখ রবিউল আলম
জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ রেলওয়ের পুরোনো ও অকেজো রেললাইন উন্মুক্ত নিলামে বিক্রি না করার যৌক্তিক কারণ এবং দেশব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনা ও মহাসড়কে প্রাণহানি প্রতিরোধে সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া বিভিন্ন দূরদর্শী পদক্ষেপের কথা জানানো হয়েছে। সংসদে উত্থাপিত আলাদা দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাবে সরকারের এই সুনির্দিষ্ট অবস্থান ও পরিকল্পনার কথা জানান সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
আজ সোমবার (১৫ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের সপ্তম দিনে সংসদ সদস্যদের লিখিত প্রস্তাব ও প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব তথ্য উপাত্ত তুলে ধরেন। এদিন সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনির এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে রেলপথ মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন রুটে বর্তমানে রেলওয়ে ট্র্যাক রিনিউয়াল বা রেললাইন পরিবর্তনের কাজ পুরোদমে চলমান রয়েছে। এই আধুনিকায়ন কাজ চলাকালীন সময়ে রেলপথ থেকে খুলে নেওয়া ব্যবহারযোগ্য রেলগুলো সংশ্লিষ্ট কাজের স্থানেই সাময়িকভাবে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সংরক্ষণ করা হয় এবং পরবর্তীতে এগুলো দিয়েই প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন সেকশনে রেল রিপ্লেসমেন্টের (প্রতিস্থাপন) কাজ সম্পন্ন করা হয়। রেল পরিবর্তনকালীন সময়ে সাময়িকভাবে এসব অকেজো বা পুরোনো রেললাইন রেলের পাশে অগোছালো অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেলেও, মূল কাজ সমাপ্ত হওয়ার পর তা রেলওয়ের নিজস্ব নির্ধারিত নিরাপদ ইয়ার্ডে সতর্কতার সঙ্গে সংরক্ষণ করা হয়।
পুরোনো রেল কেন নিলামে বিক্রি করা হচ্ছে না, তার সুনির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করে মন্ত্রী বলেন, “এসব অকেজো ও পুরোনো রেললাইন পরবর্তীতে রেলওয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উইং তথা; এমব্যাঙ্কমেন্ট প্রটেকশন বা রেললাইনের বাঁধ সুরক্ষার কাজে রিটেইনিং ওয়াল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। একইসঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা অবৈধ লেভেলক্রসিং গেটগুলোতে সাধারণ মানুষের অনাকাঙ্ক্ষিত চলাচল বন্ধ করতে ‘রেলফেন্সিং’ বা মজবুত বেড়া দেওয়ার কাজেও এগুলো অত্যন্ত কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশ রেলওয়ের নিরাপত্তা যেমন নিশ্চিত হচ্ছে, ঠিক তেমনি নতুন লোহার বেড়া বা সুরক্ষা সামগ্রী কেনা বাবদ সরকারের একটি বিশাল অঙ্কের আর্থিক ব্যয় সাশ্রয় হচ্ছে। অকেজো রেলগুলো এভাবে সরাসরি রেলওয়ের নিজস্ব নিরাপত্তা ও সুরক্ষার কাজে শতভাগ পুনর্ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় তা উন্মুক্ত নিলামে বিক্রি করা সম্ভব নয়।”
অন্যদিকে, দেশের সড়ক-মহাসড়কে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনা এবং মূল্যবান প্রাণহানি রোধে সরকারের গৃহীত মহাপরিকল্পনা সম্পর্কে সংসদ সদস্য মো. শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের এক প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সরকারের বিভিন্ন বিভাগ বর্তমানে অত্যন্ত সমন্বিত ও সক্রিয়ভাবে মাঠে কাজ করছে।
মন্ত্রী জানান, দেশের জেলা মহাসড়ক, আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং জাতীয় মহাসড়কগুলোর যেসব নির্দিষ্ট জায়গায় বারবার দুর্ঘটনা ঘটে, সেই অতি-ঝুঁকিপ্রবণ বাঁক বা ‘ব্ল্যাক স্পট’গুলোকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এরইমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেসব বিপজ্জনক স্থানে দ্রুত সড়ক সংস্কার কাজ পরিচালনার পাশাপাশি চালকদের সতর্ক করার জন্য প্রয়োজনীয় সাইন-সিগন্যাল ও ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড স্থাপন করা হচ্ছে। একইসঙ্গে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলোতে স্পিডব্রেকার নির্মাণ, পথচারীদের জন্য স্পষ্ট জেব্রা ক্রসিং এবং চালকদের ঘুম ও অসতর্কতা কাটাতে মহাসড়কে ‘রাম্বল স্ট্রিপ’ বা বিশেষ গতিরোধক রেখা স্থাপন করার কাজও দেশজুড়ে পুরোদমে চলমান রয়েছে।
সেতু মন্ত্রী সংসদে স্পষ্ট করেন যে, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন বা রাস্তা প্রশস্ত করাই যথেষ্ট নয়, বরং চালক ও সাধারণ মানুষের জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও সরকার বিশেষ জোর দিচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধসহ সামগ্রিক সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দেশব্যাপী ব্যাপক সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন বা প্রচারণামূলক কার্যক্রম চালানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় 'বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্প' নামে একটি বিশেষ মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো সড়ক দুর্ঘটনাজনিত কারণে হতাহত এবং গুরুতর আঘাতের সংখ্যা একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রার ভিত্তিতে উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করা।
পাশাপাশি গাড়িচালকদের পেশাদার দক্ষতা ও মানসিক সচেতনতা বাড়াতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএ (BRTA)-এর মাধ্যমে একটি বৈপ্লবিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, “এখন থেকে দেশব্যাপী বছরব্যাপী পেশাজীবী ভারী ও মাঝারি পরিবহন গাড়িচালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়নের (রিনিউ) আগে বাধ্যতামূলকভাবে সচেতনতা ও দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক ‘রিফ্রেশার্স প্রশিক্ষণ’ বা ডে-লং কোর্স দেওয়া হচ্ছে। ফিটনেসবিহীন অবৈধ যানবাহন এবং অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালকদের কারণে মহাসড়কে যে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানি ঘটে, তা কঠোরভাবে প্রতিরোধে এই বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল সচেতনতামূলক কার্যক্রম অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।”