শনিবার ১৩, জুন ২০২৬

১৩ জুন ২০২৬, ১১:০১ পিএম

রাজনৈতিক-ব্যবসায়িক আধিপত্যের দ্বন্দ্বে খুন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা বিল্লাল

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯ জুন ২০২৬, ১১:২১ এএম

1705

বাম পাশে হত্যাকাণ্ডের শিকার স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা বিল্লাল হোসেন তালুকদার, ডান পাশে হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত যুবদল নেতা দিদারুল ইসলাম বাবু

রাজধানীর রমনা থানা এলাকার মৌচাক-আনারকলি মার্কেট সংলগ্ন ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও এলাকার একক আধিপত্য বিস্তারের পুরোনো রেষারেষির জেরে নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল হোসেন তালুকদার। স্থানীয় সূত্র ও নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে এমনটাই দাবি করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে রাতেই অভিযুক্ত যুবদল নেতা দিদারুল ইসলাম বাবুকে দল থেকে স্থায়ী বহিষ্কার এবং রমনা থানা যুবদলের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার (৮ জুন) রাত আনুমানিক ৮টার দিকে রমনা থানা এলাকার সিদ্ধেশ্বরী বয়েজ স্কুলের পাশে আনারকলি সুপার মার্কেটের পার্কিং স্থানে এই ঘটনা ঘটে। নিহত বিল্লাল হোসেন তালুকদার রমনা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক ছিলেন। তিনি পেশায় একজন সিমেন্ট-বালু ব্যবসায়ী ছিলেন এবং মগবাজারের পৃথক দুটি এলাকায় দুই পরিবার ও ৬ সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন।

নিহতের ভাগনে ও ঘটনার সরাসরি প্রত্যক্ষদর্শী মোবারক হোসেন আকাশ অভিযোগ করে বলেন, *"সোমবার রাতে আমরা কয়েকজন আনারকলি মার্কেটের পার্কিং স্পটে অবস্থান করছিলাম। এ সময় আনারকলি সুপার মার্কেট কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও রমনা থানা যুবদলের আহ্বায়ক দিদারুল ইসলাম বাবু তার সাঙ্গোপাঙ্গোদের নিয়ে সেখানে আসেন এবং আমাদের সাথে তীব্র কথা কাটাকাটিতে জড়িয়ে পড়েন।"*

আকাশ আরও জানান, কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে দিদারুল ইসলাম বাবু নিজে কোমর থেকে ছোরা বের করে বিল্লালকে আঘাত করার চেষ্টা করেন। তখন ধস্তাধস্তির কারণে ছোরাটি মাটিতে পড়ে গেলে দিদারুলের সহযোগী হিসেবে পরিচিত সিরাজুল মাটিতে পড়া ছোরাটি তুলে বিল্লালের বুকে সজোরে বসিয়ে দেয়। এরপর রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আজ মঙ্গলবার সকালে ঢামেক মর্গে নিহতের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

স্থানীয় সূত্র ও নিহতের পরিবারের দাবি, এটি তাৎক্ষণিক কোনো মারধরের ঘটনা নয়, এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক আধিপত্যের সুগভীর দ্বন্দ্ব।

আকাশের ভাষ্যমতে, বিল্লাল হোসেন তালুকদার সিনিয়র রাজনীতিবিদ হওয়ায় মৌচাক-আনারকলি মার্কেটের আশেপাশের ফুটপাতের ক্ষুদ্র দোকানদাররা যেকোনো সমস্যা বা অভ্যন্তরীণ ঝগড়া হলে বিল্লালের শরণাপন্ন হতেন এবং বিল্লালও সেসবের সুষ্ঠু মীমাংসা করে দিতেন। কিন্তু ফুটপাতে চাঁদাবাজির একক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে যুবদল নেতা দিদারুল ইসলাম বাবু এই সালিশি প্রথা একদমই পছন্দ করতেন না এবং বিল্লালের ওপর তার চরম ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ক্ষোভ ছিল। এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে মালিবাগে সোহাগ পরিবহনের কার্যালয়ে ভাঙচুরের একটি মামলায় দিদারুল ইসলামের চক্রান্তে বিল্লালকে আসামি করে তিন মাস জেল খাটানো হয়েছিল এবং পরবর্তীতে জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি বিষয়টি মীমাংসা করে নেন বলেও নিহতের পরিবার অভিযোগ করে।

হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠার পরপরই রাতেই যুবদলের পক্ষ থেকে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রমনা থানা যুবদলের একাধিক নেতা নিশ্চিত করেছেন যে, বিল্লাল হোসেনকে হত্যার ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে রমনা থানা যুবদলের আহ্বায়ক দিদারুল ইসলাম বাবুকে পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একইসঙ্গে রমনা থানা যুবদলের বর্তমান সক্রিয় কমিটিও সম্পূর্ণ বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় যুবদল সংগঠন।

এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ডিএমপির রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) শেখ ஜাহিদুল ইসলাম জানান, নিহত ব্যক্তি ও যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, দুজনেই রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তি। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, প্রাথমিক তদন্তে দলীয় কোনো বিরোধ বা রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের তথ্য সরাসরি না পাওয়া গেলেও মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে জানা গেছে।

অবশ্য পুলিশের অপর একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, মৌচাক-আনারকলি এলাকার ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজির আধিপত্য বিস্তার নিয়ে পূর্বশত্রুতার বিষয়টিই তাদের প্রাথমিক সন্দেহের তালিকার শীর্ষে রয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ ও পেছনের মূল কুশীলবদের খুঁজতে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। মূল অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে ইতিমধ্যেই সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে এবং এ ঘটনায় রমনা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

Link copied!