প্রকাশিত: ০৯ জুন ২০২৬, ০৩:৪০ পিএম
1700
১৪ জুন ২০২৬, ১১:৪৬ এএম
বিগত কয়েক বছরে দেশ অনেক আলোচনা, বিতর্ক ও সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ুম। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, "আমরা অনেক কিছু করতে পারিনি, অনেককে যুক্ত করতে পারিনি এবং অনেক ক্ষেত্রে আমাদের আপসও করতে হয়েছে। কিন্তু তারপরও আমাদের মনে একটিই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল, যাতে এ দেশের সাধারণ জনগণের আত্মত্যাগ আবারও কোনোভাবে ব্যর্থ না হয়।"
আজ মঙ্গলবার (৯ জুন) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের আবদুস সালাম হলে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। 'রাজনৈতিক তাত্ত্বিক সিরাজুল আলম খানের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে গণভোট, রাষ্ট্র সংস্কার ও সিরাজুল আলম খানের প্রাসঙ্গিকতা' শীর্ষক এই সভায় সভাপতিত্ব করেন জেএসডির জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি তানিয়া রব।
হাসনাত কাইয়ুম তাঁর বক্তব্যে দেশের রাজনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, "আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা হলো— আন্দোলন ও সংগ্রামে দেশের সাধারণ জনগণ জীবন দেয়, রক্ত দেয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার সুফল অনেক সময় আর জনগণের নিজের হাতে পৌঁছায় না। সেই ব্যর্থতার পুরোনো চক্র ভাঙারই একটি সচেতন চেষ্টা ছিল আমাদের। আমরা চেয়েছিলাম দেশে এমন একটি টেকসই রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে, যেখানে পরিবর্তনের জন্য মানুষকে যেন বারবার রাজপথে রক্ত দিতে না হয়।"
তিনি জানান, এই চিন্তা থেকেই মূলত 'সংবিধান সংস্কার পরিষদের' ধারণাটি সামনে আনা হয়েছিল। তাঁদের প্রস্তাব ছিল, ভবিষ্যতে সংবিধানে কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দিলে, তা যেন আর কোনো অভ্যুত্থান, সংঘর্ষ বা রক্তপাতের মাধ্যমে না হয়। জনগণ সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট 'সংস্কার পরিষদ' গঠন করবে এবং সেই পরিষদ জনগণের ম্যান্ডেট (গণরায়) অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করবে।
এই প্রস্তাবটি রাজনৈতিকভাবে বেশিদূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করে হাসনাত কাইয়ূম বলেন, যারা দেশে একটি বিকল্প রাজনৈতিক ধারার উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি করতে পারতেন, তাদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার অংশ হয়ে গেছেন। ফলে যে ঐতিহাসিক সুযোগটি তৈরি হয়েছিল, তা আর পূর্ণতা পায়নি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক গণ-আন্দোলন কিংবা সাম্প্রতিক সময়ের আন্দোলন— সবক্ষেত্রেই দেখা গেছে জনগণের সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত জনগণের হাতছাড়া হয়ে গেছে। মানুষ যাদের পরম বিশ্বাসে নেতা বানায়, যাদের জন্য জীবন উৎসর্গ করে, অনেক সময় তারাই পরে সাধারণ জনগণের প্রতিনিধিত্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
সিরাজুল আলম খানের ১৯৭২ সালের একটি ঐতিহাসিক উক্তি স্মরণ করে তিনি বলেন, "সিরাজুল আলম খান ১৯৭২ সালে ‘একজন দেবতার পতন’ বলেছিলেন। আমার কাছে এই কথার গভীর অর্থ হলো— জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিরা যখন খোদ জনগণ থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন তারা আর জনগণের প্রকৃত নেতা থাকে না। আর এই বিচ্ছিন্নতার মধ্য দিয়েই এক ধরনের 'রাজনৈতিক দানবায়ন' শুরু হয়।"
বিজয় বারবার বেহাত হয়ে যাওয়ার পেছনের কারণ বিশ্লেষণ করে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের এই শীর্ষ নেতা বলেন, আন্দোলনের সময় আমরা কেবল 'জয়ের' কথা ভাবি। কিন্তু কারা সেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, তাদের প্রকৃত রাজনৈতিক অবস্থান কী, তারা জনগণের স্বার্থের পক্ষে নাকি বিপক্ষে— এসব মৌলিক প্রশ্নকে আমরা গুরুত্ব দিই না। আমরা মনে করি, আগে যেকোনো মূল্যে জিততে হবে, পরে অন্য হিসাব করা যাবে। ফলে আন্দোলনের ভেতরে দালাল, সুবিধাবাদী কিংবা জনগণের স্বার্থবিরোধী অপশক্তিও সহজেই জায়গা পেয়ে যায় এবং পরে তারাই সংগ্রামের মূল অর্জনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে।
ভবিষ্যতের লড়াইয়ের জন্য নতুনভাবে চিন্তা করার আহ্বান জানিয়ে হাসনাত কাইয়ুম বলেন, শুধু কীভাবে জিতব তা নয়, বরং কারা এই লড়াইয়ে থাকবে এবং কারা জনগণের সংগ্রামকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চায়— সেই প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে হলে রাজনৈতিক দল, নেতৃত্ব এবং জনগণের মধ্যে জবাবদিহি ও মালিকানার সম্পর্ক নতুন করে পুনর্গঠন করতে হবে, অন্যথায় ইতিহাসের এই নির্মম পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।