প্রকাশিত: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:২৬ এএম
2006
শুক্রবার ১৭, এপ্রিল ২০২৬ -- : -- --
গ্রাফিক্স: যায়দিন প্রতিদিন
বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বাধীনতার পর মাত্র তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও চলতি বছরের গণভোটকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এবারের গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নিয়ে, যা দেশের সংবিধান সংস্কারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। তবে নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে এই সনদ ও গণভোটের প্রশ্ন নিয়ে ততই বাড়ছে বিভ্রান্তি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গণভোট এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে জনগণ সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মত প্রকাশ করে। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, জুলাই সনদ কী, এতে কী কী প্রস্তাব রয়েছে—তা সম্পর্কে এখনো ভোটারদের বড় একটি অংশ অবগত নয়। ফলে অনেকেই নিশ্চিত নন, ব্যালটে তারা কোন অপশনে সিল দেবেন।
বাংলাদেশে প্রথম গণভোট অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৭ সালের ৩০ মে, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসন ও নীতির প্রতি জনগণের আস্থা যাচাইয়ের জন্য। ওই গণভোটে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৮৮ শতাংশের বেশি এবং বিপুল সংখ্যক ভোট ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে পড়ে।
এরপর ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ দ্বিতীয় গণভোট আয়োজন করেন তৎকালীন সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। নির্বাচন কমিশনের হিসাবে, সে সময় ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭২ শতাংশের বেশি।
তৃতীয় গণভোট হয় ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর স্বৈরাচার পতনের পর রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা থেকে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার লক্ষ্যে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী অনুমোদনের জন্য ওই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এরপর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে প্রণীত হয় জুলাই জাতীয় সনদ, যেখানে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এই প্রস্তাবগুলোর মধ্যে সংবিধান সম্পর্কিত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব গণভোটে উপস্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব প্রস্তাব চারটি ভাগে ভাগ করে একটি মাত্র প্রশ্নের মাধ্যমে ভোটারদের মতামত নেওয়া হবে।
তবে গণভোটের প্রশ্নের ভাষা জটিল হওয়ায় অনেকেই অভিযোগ করছেন, সাধারণ ভোটারের পক্ষে এটি বোঝা কঠিন। অধিকাংশ মানুষেরই ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাবের বিস্তারিত ধারণা নেই।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা যতটা হচ্ছে, গণভোট নিয়ে ততটা হচ্ছে না। তার মতে, সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে দ্রুত মাঠপর্যায়ে প্রচার বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, লিফলেট বিতরণ, টেলিভিশনে ব্যাখ্যামূলক অনুষ্ঠান, ডকুমেন্টারি প্রচার এবং প্রশিক্ষিত কর্মী নিয়োগের মাধ্যমে জনগণকে জানাতে হবে—গণভোটে তারা ঠিক কী বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, সংসদ নির্বাচনের প্রচার শুরু হবে ২১ জানুয়ারির পর। তবে গণভোটের প্রচারে এখনো কোনো আইনি বাধা নেই। তবুও বড় রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে জোরালো প্রচারণা চোখে পড়ছে না।
কিছু দল প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিলেও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি দলের নেতা-কর্মীদের ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচার করতে দেখা যাচ্ছে। এতে ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট ‘হ্যাঁ’ হলে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। এই পরিষদ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংস্কার কার্যক্রম শেষ না হলে, গণভোটে অনুমোদিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে।
সরকার ও নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, গণভোট নিয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মাঠপর্যায়ে একযোগে প্রচার চালানো হচ্ছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি দপ্তর, এনজিও এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় এই প্রচার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
সরকার আশা করছে, নির্বাচনের আগেই সাধারণ মানুষ জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের গুরুত্ব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবে এবং সচেতনভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে।