প্রকাশিত: ০৪ জুন ২০২৬, ১১:০৭ এএম
1705
০৬ জুন ২০২৬, ০৪:০৬ এএম
মানুষের জন্মের মতো মৃত্যুও একটি অনিবার্য সত্য। কিন্তু যে মানুষটি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন, যার কোনো আপনজন নেই, যে মানুষটি পথের ধারে নিঃসঙ্গ মৃত্যুবরণ করে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করার দায়িত্ব কে নেবে?
এই মানবিক প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়েই গত শতাব্দীর শুরুতে কলকাতার বুকে জন্ম নিয়েছিল একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম। আজ ১২০ বছরেরও বেশি সময় পরে সেই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম এবং ঐতিহ্যবাহী জনকল্যাণমূলক সংস্থা হিসেবে অবিচল দাঁড়িয়ে আছে।
প্রতিষ্ঠার পটভূমি ও ইতিহাস:
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের চাপে মুসলমান সমাজ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত দিক থেকে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছিল। এই কঠিন সময়ে মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণ ও কল্যাণের জন্য কিছু সংবেদনশীল মানুষ এগিয়ে এসেছিলেন। তাঁদেরই একজন ছিলেন গুজরাটের সুরাট থেকে আসা ব্যবসায়ী শেঠ ইব্রাহিম মোহাম্মদ ডুপ্লে।
১৯০৫ সালে শেঠ ইব্রাহিম মোহাম্মদ ডুপ্লের উদ্যোগে এবং তৎকালীন মুসলিম সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বদের সহায়তায় কলকাতায় আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল একটিই বেওয়ারিশ মুসলমানদের লাশ যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদায় দাফন করা। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে এটি ছিল একটি অত্যন্ত মানবিক ও সাহসী উদ্যোগ।
প্রতিষ্ঠার পেছনে যাঁরা সহায়তা করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মৌলভী মোহাম্মদ ইসা খান, মৌলভী মোহাম্মদ হেদায়েত হোসেন, মুনসী চৌধুরী আমানুল্লাহ, মুনসী হাফিজ নাজির আহমদ প্রমুখ। পরবর্তীকালে তৎকালীন রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব খাজা নাজিমুদ্দিন, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো নেতারাও এই প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। ফলে প্রতিষ্ঠানটি শুধু একটি সেবাসংস্থাই নয়, পরিণত হয়েছিল একটি সমাজ আন্দোলনের কেন্দ্রে।
দেশভাগ ও ঢাকায় নতুন অধ্যায়:
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পূর্ব বাংলার মুসলমানদের সেবায় ঢাকায় আঞ্জুমানের শাখা স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সেই উদ্দেশ্যে কলকাতা থেকে প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রশাসক এস. এম. সালাহউদ্দিনকে সর্বময় কর্তৃত্ব দিয়ে ঢাকায় পাঠানো হয়। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহেই ঢাকায় আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
দেশভাগের পর নতুন প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম দ্রুত বিস্তার লাভ করে। হাবিবুল্লাহ বাহার, বিচারপতি হামদুর রহমান, বিচারপতি এস. এম. মোরশেদ, বিচারপতি আব্দুর রহমান চৌধুরীসহ একঝাঁক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের নেতৃত্বে সেবামূলক কর্মকাণ্ডে নতুন মাত্রা যোগ হতে থাকে। পরবর্তীকালে এ. বি. এম. গোলাম কিবরিয়া যিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা, আইজিপি এবং রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তাঁকে আধুনিক আঞ্জুমানের রূপকার হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের পরের সংকট ও পুনরুজ্জীবন:
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সদ্যগঠিত সরকার আঞ্জুমানকে একটি সাম্প্রদায়িক সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে এর আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে দেয়। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে। কিন্তু ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় এই ধরনের একটি মানবসেবী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হয়। সরকার তখন তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে এবং আঞ্জুমানকে পুনরুজ্জীবিত করার পথে এগিয়ে আসে। সেই থেকে প্রতিষ্ঠানটি আর পেছনে ফিরে তাকায়নি।
সাংগঠনিক কাঠামো:
আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম ১৮৬০ সালের সোসাইটিজ রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্টের আওতায় নিবন্ধিত একটি সেবামূলক, অমুনাফামুখী ও অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির সর্বোচ্চ পরিচালনা পর্ষদ হলো 'জেনারেল কাউন্সিল', যেখানে সকল জীবন সদস্য, সাধারণ সদস্য ও মনোনীত সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত। জেনারেল কাউন্সিল থেকে নির্বাচিত সভাপতি, দশজন ট্রাস্টি এবং দশজন সহসভাপতিসহ মোট ৭৮ জন সদস্য নিয়ে গঠিত ব্যবস্থাপনা কমিটিই প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। একজন নির্বাহী পরিচালক সামগ্রিক প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন।
বর্তমানে ঢাকার কাকরাইলে প্রধান কার্যালয়ের পাশাপাশি সারা বাংলাদেশের ৩২টিরও বেশি জেলায় প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদিত শাখা রয়েছে। প্রতিটি শাখার নিজস্ব ব্যবস্থাপনা কমিটি থাকলেও তারা কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির নিকট দায়বদ্ধ।
কার্যক্রমের বিস্তৃতি: বেওয়ারিশ লাশ দাফন থেকে বহুমুখী সেবায়
আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের সবচেয়ে প্রাচীন ও পরিচিত কার্যক্রম হলো বেওয়ারিশ ও নিঃসহায় মানুষের লাশ দাফনের ব্যবস্থা করা। শুধু মুসলমান নয়, সকল ধর্মের বেওয়ারিশ মানুষের শেষকৃত্যেও প্রতিষ্ঠানটি সহায়তা দিয়ে থাকে। ঢাকার প্রধান শাখা এবং কাকরাইল শাখায় 'দাফন সেবা' কার্যক্রমের মাধ্যমে লাশের গোসল, কাফনের কাপড়, কফিন বাক্স এবং সংশ্লিষ্ট সকল সেবা বিনামূল্যে প্রদান করা হয়।
এর পাশাপাশি ঢাকা মহানগর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে বিনামূল্যে রোগী ও লাশ পরিবহনের সুবিধা দেওয়া হয়। ঢাকার বাইরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও এই সেবা পৌঁছে দেওয়া হয়।
এতিম শিশুদের লালনপালন আঞ্জুমানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম। ঢাকা মহানগর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভারের নয়টি এতিমখানায় চার শতাধিক এতিম শিশুকে আশ্রয়, খাদ্য, বস্ত্র ও শিক্ষা দিয়ে লালনপালন করা হচ্ছে। শিক্ষা খাতেও প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৭০০ দরিদ্র শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট পরিচালনার মাধ্যমে কারিগরি শিক্ষার প্রসারেও সংস্থাটি কাজ করছে।
প্রতিষ্ঠানটি মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণেও কাজ করে। মুক্তিযোদ্ধা ভাতাসহ দুঃস্থ ও বয়স্ক নারী-পুরুষদের নিয়মিত আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিশ্ব ইজতেমায় বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ তৎপরতা, শীতবস্ত্র বিতরণ, বিনামূল্যে ফ্রাইডে ক্লিনিক পরিচালনা এবং অসহায় পরিবারের সহায়তাসহ বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে থাকে।
জেলা শাখার কার্যক্রম:
শুধু কেন্দ্রেই নয়, সারা দেশে আঞ্জুমানের কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিটি জেলা শাখা নিজ নিজ এলাকায় বেওয়ারিশ লাশ দাফন, দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা সহায়তা, এতিম শিশুদের সেবা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগকালে জরুরি ত্রাণ বিতরণের কাজ করে যাচ্ছে। নেত্রকোণা, সাতক্ষীরা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলার শাখাগুলো স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে সেবার আলো।
চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা:
১২০ বছরের পথচলায় আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামকে বহু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। রাজনৈতিক বৈরিতা, আর্থিক সংকট, সাংগঠনিক দুর্বলতা সব কিছু উপেক্ষা করেই প্রতিষ্ঠানটি টিকে আছে এবং সামনে এগিয়ে চলছে। তবে নগরায়ণ এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বেওয়ারিশ মৃত্যু, এতিম শিশুর সংখ্যা এবং দুঃস্থ মানুষের চাহিদা বাড়ছে। এই বিশাল চাহিদা পূরণে আরও বেশি সম্পদ, জনবল এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় প্রয়োজন।
অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানটির প্রতি সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও বিত্তশালী শ্রেণির সহায়তা এবং সরকারের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি পেলে আঞ্জুমান আরও বহু মানুষের জীবনে আলো জ্বালাতে সক্ষম হবে।
উপসংহার:
একটি মৃত মানুষকে মর্যাদার সাথে শেষ বিদায় দেওয়া এই সামান্য কিন্তু অসামান্য উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের। কালের বিবর্তনে এই প্রতিষ্ঠান আজ মানবসেবার একটি বহুমাত্রিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বেওয়ারিশ লাশের দাফন থেকে শুরু করে এতিম শিশুর লালনপালন, গরিব শিক্ষার্থীর পড়াশোনার সুযোগ থেকে দুঃস্থ বৃদ্ধের ভাতা এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের বিস্তার আজ সমাজের সব স্তরে।
যখন রাষ্ট্র পৌঁছাতে পারে না, যখন পরিবার থাকে না, যখন সমাজ মুখ ফিরিয়ে নেয় তখনও আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম থাকে। এটিই তার সবচেয়ে বড় পরিচয়, এটিই তার শক্তি। এই প্রতিষ্ঠানের ১২০ বছরের ইতিহাস আসলে মানবতার প্রতি বিশ্বাস রাখার ইতিহাস সেই বিশ্বাস যে, মানুষ মানুষের জন্য।
লেখক: খোন্দকার শাহিদুল হক