প্রকাশিত: ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৩৫ পিএম
2068
শুক্রবার ১৭, এপ্রিল ২০২৬ -- : -- --
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টির নাম বহাল রেখে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দিয়েছে জাতীয় সংসদ।
বিলটি পাসের সময় এ বিষয়ে আপত্তি জানায় জামায়াতে ইসলামী। তবে তাদের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) লিখিতভাবে জানায়, এ বিলের প্রতি তাদের কোনো আপত্তি নেই।
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত সংসদের বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বিলটি উপস্থাপন করেন। পরে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়। বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান বিলের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখলেও তিনি নির্দিষ্ট কোনো ধারায় সংশোধনের প্রস্তাব দেননি। এ কারণে স্পিকার তার আপত্তি নিষ্পত্তির জন্য আলাদা ভোট গ্রহণ করেননি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীও এ বিষয়ে কোনো জবাব দেননি।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টিকে অপরিবর্তিত অবস্থায় বিল হিসেবে উত্থাপনের সুপারিশ করে সংসদের বিশেষ কমিটি। ওই প্রতিবেদনে জামায়াতের সংসদ সদস্যরা ভিন্নমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেন। তাদের মতে, অধ্যাদেশটি অপরিবর্তিতভাবে পাস হলে দেশের বিদ্যমান কয়েকটি রাজনৈতিক দলকে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হবে, যা যুক্তিযুক্ত নয়।
জামায়াতের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দগুলোর সংজ্ঞা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। তারা উল্লেখ করেন, ২০০২ সালে প্রণীত আইনে এসব রাজনৈতিক দলকে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। একটি রাজনৈতিক দলকে সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে এক কাতারে ফেলা গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও মন্তব্য করেন তারা।
অধ্যাদেশে যা বলা হয়েছে
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা এই অধ্যাদেশে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধার সহযোগী, মুক্তিযোদ্ধা পরিবার এবং মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য সম্পর্কে বিস্তারিত সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
বীর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে ভারতে অবস্থিত প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে নিবন্ধিত ব্যক্তিরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন। একই সঙ্গে যারা স্বাধীনতার লক্ষ্যে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন এবং তাদের সহযোগী বাহিনী রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসসহ তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন, তারাও এই স্বীকৃতির আওতায় পড়বেন।
এছাড়া সশস্ত্র বাহিনী, মুক্তিবাহিনী, বিএলএফ, পুলিশ, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), নৌ-কমান্ডো, কিলো ফোর্স ও আনসার সদস্যদেরও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য করা হবে।
মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞা
অধ্যাদেশে মুক্তিযুদ্ধকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত সেই যুদ্ধ হিসেবে, যার লক্ষ্য ছিল একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। এই যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে।
বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্য
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাশা ছিল একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। তবে স্বাধীনতার পর বাস্তবতা সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। তিনি অভিযোগ করেন, জনগণের রায়ের প্রতি সম্মান দেখাতে ব্যর্থতার কারণেই মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল, কিন্তু পরবর্তী সময়ে শাসকগোষ্ঠী সেই ইতিহাস থেকে বিচ্যুত হয়।
তিনি আরও বলেন, একসময় দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র বিলুপ্ত করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল এবং স্বল্প সময়ের আলোচনায় রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং বর্তমান সংসদ সেই ধারাবাহিকতার অংশ।
জামুকা আইনের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, এ ধরনের সংজ্ঞা পূর্ববর্তী সরকারগুলো প্রণয়ন করেনি। বরং পরবর্তী সময়ে তা যুক্ত করা হয়েছে এবং বর্তমান অধ্যাদেশে সামান্য পরিবর্তনসহ তা বহাল রাখা হয়েছে।
জামায়াতের আমির আরও বলেন, ১৯৭১ সালের ঘটনাবলির পূর্ণাঙ্গ সত্য সম্পর্কে আল্লাহই একমাত্র সাক্ষী, আর মানুষ কেবল আংশিকভাবে তা উপলব্ধি করতে পারে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দেশের সব রাজনৈতিক দল দায়িত্বশীলতা ও দেশপ্রেমের সঙ্গে কাজ করবে এবং ভবিষ্যতে বিভাজনের পরিবর্তে ঐক্য প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে।
তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭৯ সালে জারি করা রাজনৈতিক দল সম্পর্কিত অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিভিন্ন দল তাদের কার্যক্রম পরিচালনার অধিকার ফিরে পায়। সেই ধারাবাহিকতায় তাদের দলও দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও একটি ঐক্যবদ্ধ ও সম্মানজনক জাতি গঠনে ভূমিকা রাখতে চায়।