শনিবার ১৩, জুন ২০২৬

১৩ জুন ২০২৬, ০১:১৭ পিএম

ভেনেজুয়েলায় আবারও মার্কিন বিমান হামলা, গ্যাং প্রধান নিহত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ জুন ২০২৬, ১১:৩৪ এএম

1696

ভেনেজুয়েলার মাটিতে আবারও এক রক্তক্ষয়ী ও অতর্কিত বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। লাতিন আমেরিকার অন্যতম কুখ্যাত এবং মোস্ট ওয়ান্টেড অপরাধী চক্র ‘ট্রেন দে আরাগুয়া’ (Tren de Aragua)-এর গোপন আস্তানায় চালানো এই বিশেষ অভিযানে গ্যাংটির সর্বোচ্চ প্রধান নিনো গেরেরো নিহত হয়েছেন। আজ শনিবার (১৩ জুন) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক জরুরি পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এই চাঞ্চল্যকর ও সামরিক অভিযানের দাবি করেছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর পোস্টে লিখেছেন, “আমার সরাসরি সুনির্দিষ্ট নির্দেশে মার্কিন সাউদার্ন কমান্ড (US SOUTHCOM) ভেনেজুয়েলার মাটিতে ‘ট্রেন দে আরাগুয়া’ গ্যাংয়ের শীর্ষনেতা নিনো গেরেরোকে চিরতরে নির্মূল করতে একটি অত্যন্ত নিখুঁত ও প্রাণঘাতী সামরিক বিমান অভিযান পরিচালনা করেছে এবং আমরা সফল হয়েছি।”

নিহত নিনো গেরেরোর পুরো নাম হেক্টর রুথেনফোর্ড গেরেরো ফ্লোরেস। তিনি দীর্ঘদিন ধরে লাতিন আমেরিকার নেটওয়ার্ক ছড়ানো এই শক্তিশালী অপরাধী চক্রের একচ্ছত্র নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন।

আইএস সমপর্যায়ের সন্ত্রাসী সংগঠন:

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে এই কুখ্যাত গ্যাংটির ‘অপ্রথাবদ্ধ যুদ্ধ’ (Unconventional Warfare) চালানোর গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। মাদক, অস্ত্র ও মানবপাচারের মাধ্যমে মার্কিন সীমানায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির দায়ে সম্প্রতি ওয়াশিংটন এই অপরাধী চক্রটিকে মধ্যপ্রাচ্যের কুখ্যাত জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (IS)-এর সমপর্যায়ের একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ (FTO) হিসেবে অফিশিয়ালি ঘোষণা করেছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজের পোস্টের সাথে একটি ড্রোন বা স্যাটেলাইট থেকে ধারণকৃত ভিডিও যুক্ত করেছেন। যেখানে দেখা গেছে, মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের নিখুঁত আঘাতে ভেনেজুয়েলার একটি সবুজ রঙের বহুতল ভবন ও তার পাশের টিনশেড কাঠামো মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্প তাঁর পোস্টে আরও দাবি করেন, “এই জটিল সামরিক অভিযানটি ভেনেজুয়েলায় অবস্থানরত আমাদের বিশ্বস্ত বন্ধুদের (স্থানীয় ভিন্নমতাবলম্বী বা বর্তমান জান্তা) সাথে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সমন্বয় করে পরিচালনা করা হয়েছে। আমরা ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় তাদের সাথে খুব ভালোভাবে একযোগে কাজ করছি।”

উল্লেখ্য, এর আগে গত জানুয়ারি মাসেও ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে একটি নাটকীয় কমান্ডো অভিযান চালিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেই অভিযানে দেশটির তৎকালীন বিতর্কিত সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সশরীরে তুলে নিয়ে মার্কিন হেফাজতে নিয়ে আসা হয়। ওয়াশিংটনের অভিযোগ ছিল, মাদুরো সরকার এই কুখ্যাত ‘ট্রেন দে আরাগুয়া’ গ্যাংয়ের সাথে সুগভীর আর্থিক ও কৌশলগত যোগসাজশ তৈরি করে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন রাষ্ট্রবিরোধী গোপন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছিল।

কারাগারকে ‘বিনোদন কেন্দ্র’ বানানো সেই গেরেরো:

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক প্রোফাইল নথিতে বলা হয়েছে, ‘ট্রেন দে আরাগুয়া’ মূলত ভেনেজুয়েলার একটি কুখ্যাত জেলখানা-ভিত্তিক গ্যাং ছিল। তবে নিনো গেরেরো এর দায়িত্ব নেওয়ার পর গ্যাংটিকে আন্তর্জাতিক ও করপোরেট অপরাধ চক্রের পর্যায়ে নিয়ে যান। তাঁকে জীবিত বা মৃত গ্রেফতারের জন্য মার্কিন প্রশাসন লাখ লাখ ডলারের আন্তর্জাতিক পুরস্কারও ঘোষণা করেছিল।

গেরেরোর নৃশংস নেতৃত্বে এই গ্যাংটি কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, পেরু এবং চিলিতে নিজেদের নেটওয়ার্ক বিস্তার করে। গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে লাতিন আমেরিকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসতে চাওয়া হাজার হাজার অসহায় অভিবাসীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক চাঁদাবাজি, নারীদের যৌন পাচার, সুপারি দিয়ে ভাড়ায় খুন এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের অপহরণের অগণিত প্রমাণ রয়েছে। গেরেরো তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময় কারান্তরালে কাটিয়েছেন। ২০১২ সালে তিনি এক কারারক্ষীকে বিপুল অংকের ঘুষ দিয়ে নাটকীয়ভাবে জেল থেকে পালিয়ে যান। তবে ২০১৩ সালে আবারও তিনি ধরা পড়েন।

গ্রেফতারের পর ভেনেজুয়েলার আরাগুয়া রাজ্যের কুখ্যাত ‘তোকোরন কারাগার’-এ বন্দি থেকেও তিনি পুরো ল্যাটিন আমেরিকার অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করতেন। নিজের ক্ষমতা ও অর্থের জোরে তিনি তোকোরন কারাগারটিকে একটি আধুনিক বিলাসবহুল বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন। সেই জেলের ভেতরেই তিনি নিজের জন্য একটি ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানা, বিলাসবহুল রেস্তোরাঁ, নাইটক্লাব, বেটিং শপ (জুয়া খেলার আড্ডা) এবং সুইমিং পুলের মতো অবিশ্বাস্য সব রাজকীয় সুযোগ-সুবিধা তৈরি করেছিলেন। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাদুরো অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে প্রায় ১১ হাজার সশস্ত্র সেনা পাঠিয়ে জেলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করলে কমান্ডোদের আসার আগেই সুড়ঙ্গ পথে আবার পালিয়ে যান গেরেরো।

মার্কিন গোয়েন্দা ও পররাষ্ট্র দপ্তর বলছে, ভেনেজুয়েলার বলিভার রাজ্যের অবৈধ স্বর্ণখনি, ক্যারিবীয় উপকূলের কুখ্যাত আন্তর্জাতিক মাদক রুট এবং ভেনেজুয়েলা ও কলম্বিয়া সীমান্তের মধ্যকার দুর্গম গোপন পারাপারগুলো পুরোপুরি গেরেরোর হাতের মুঠোয় ছিল। এই গ্যাংটির বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অন্তত আটটি প্রধান দেশে সরাসরি অপরাধমূলক আধিপত্য ও শক্তিশালী স্লিপার সেল রয়েছে।

মার্কিন অভিযানের বৈধতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা:

ল্যাটিন আমেরিকা অঞ্চলে মাদক পাচার রুখতে ও এই গ্যাংটির নেটওয়ার্ক ভাঙতে আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন নৌ ও বিমান বাহিনী এ পর্যন্ত মাদকবাহী বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও মাছ ধরার স্পিডবোটে কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের দাবি, ধ্বংস হওয়া এসব নৌযান ট্রেন দে আরাগুয়ার লজিস্টিক সাপোর্টের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল।

তবে মার্কিন প্রথম সারির প্রধান সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত মার্কিন সামরিক বাহিনীর এ ধরনের একতরফা হামলায় প্রায় ২০০-র বেশি সাধারণ ও নিরপরাধ মানুষ নিহত হয়েছেন। সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো, মার্কিন সামরিক বাহিনী বা পেন্টাগন এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আদালতের কাছে ধ্বংস করা নৌযানগুলোর বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট কোনো মাদক পাচারের অকাট্য আইনি প্রমাণ দাখিল করতে পারেনি। ফলে আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও মানবাধিকার সংস্থাসমূহের মাঝে মার্কিন সাউথকমের এই একতরফা হামলার বৈধতা এবং অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নীতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও আইনি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

Link copied!