মঙ্গলবার ১৬, জুন ২০২৬

১৬ জুন ২০২৬, ০৮:৪৪ পিএম

অনুমোদন ছাড়াই পদ্মা রেলসেতুর পিলারের নিচ থেকে কাটা হচ্ছে মাটি: তদন্তে প্রশাসন

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ জুন ২০২৬, ০৬:৪০ পিএম

1698

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার আলীগঞ্জ এলাকায় কোনো প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়াই পদ্মা রেলসেতুর পিলারের (খুঁটি) একদম নিচ থেকে আশঙ্কাজনকভাবে মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এই কাণ্ডজ্ঞানহীন বালু ও মাটি কাটার ফলে দেশের অন্যতম মেগা যোগাযোগ অবকাঠামো এই রেলসেতুটি চরম কাঠামোগত ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সম্প্রতি এই মাটি কাটার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হওয়ার পর জেলা প্রশাসনের টনক নড়ে এবং তাদের নির্দেশে উপজেলা প্রশাসন ও রেলওয়ে কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তবে বাংলাদেশ রেলওয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এ ধরনের পিলারের গোড়ার মাটি কাটার কোনো অনুমোদন তারা কাউকে দেয়নি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সরাসরি অভিযোগ, আলীগঞ্জ এলাকায় ব্রিজের পিলারের গোড়া থেকে ড্রেজার ও এক্সকাভেটর দিয়ে আইনবহির্ভূতভাবে মাটি কেটে স্থানীয় ইটভাটায় ট্রলার ও ড্রাম ট্রাকে করে বিক্রি করছেন ফতুল্লার সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য (মেম্বার) আবুবক্কর এবং তাঁর অনুসারী একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। সাধারণ মানুষ বাধা দিলে তারা সরকারের অনুমতি রয়েছে দাবি করে একটি ভুয়া বা রহস্যজনক কাগজপত্র প্রদর্শন করে পিলারের গোড়ার মাটি কেটে আসছিল।

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক (ডিসি) কার্যালয় সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, পিলারের নিচ থেকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে মাটি কাটার ওই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেলা প্রশাসকের দৃষ্টিগোচর হয়। বিষয়টি জাতীয় সুরক্ষার সাথে জড়িত থাকায় তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) সরজমিনে গিয়ে সত্যতা যাচাই ও ব্যবস্থা নেওয়ার কঠোর নির্দেশনা দেন।

এ বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘জেলা প্রশাসক স্যারের জরুরি নির্দেশনা পাওয়ার পর পরই আমি ফতুল্লার সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ডকে ফোর্সসহ ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছিলাম। তদন্তের সময় সেখানে বাংলাদেশ রেলওয়ের স্থানীয় কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। তবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে যাঁরা মাটি কাটছেন, তাঁরা একটি প্রশাসনিক কাগজ দেখিয়ে দাবি করেছেন যে, তাঁদের নাকি এই মাটি কাটার বৈধ অনুমতি রয়েছে।’

তবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা ফতুল্লার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসাদুজ্জামান জানান ভিন্ন তথ্য। তিনি বলেন, ‘ইউএনও মহোদয়ের নির্দেশে আমি সেখানে যাই। এই রেলসেতুটি মূলত বাংলাদেশ রেলওয়ের হলেও মেগা প্রকল্পটির নির্মাণ ও তদারকির মূল দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। যাঁরা সেখান থেকে মাটি কেটে নিচ্ছেন, তাঁরা আমাদের জানিয়েছেন যে তাঁরা এই মেগা প্রকল্পের মূল নির্মাণকারী চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা চায়না কোম্পানির কাছ থেকে এক্সকাভেশনের (মাটি কাটা) একটি বিশেষ “ওয়ার্ক অর্ডার” পেয়েছেন এবং এটি নাকি এই প্রকল্পেরই টেকনিক্যাল কাজের অংশ। তবে যেহেতু স্পর্শকাতর পিলারের নিচ থেকে মাটি কাটা নিয়ে জনমনে তীব্র বিতর্ক ও সেতু ঝুঁকির শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে, তাই সার্বিক তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাময়িকভাবে সেখানকার সব ধরনের মাটি কাটার কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

এদিকে চায়না কোম্পানির তথাকথিত সেই ওয়ার্ক অর্ডারের সত্যতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ রেলওয়ে ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা শিমুল কুমার সাহা এ প্রসঙ্গে দৃঢ়তার সাথে বলেন, ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে কখনো কোনো রাষ্ট্রীয় রেলসেতুর পিলারের গোড়া বা নিচ থেকে এভাবে মাটি কাটার কোনো ধরণের বাণিজ্যিক বা অন্য কোনো অনুমোদন দেয় না, দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। যাঁরা সেখানে মাটি কাটছেন, তাঁরা যদি কোনো অনুমোদন বা ওয়ার্ক অর্ডারের কাগজ দেখিয়ে থাকেন, তবে সেটা সম্পূর্ণ ভুয়া ও জালিয়াতি করা। নয়তো তাঁদের সেই কাগজপত্রের বৈধতা ও উদ্দেশ্য উচ্চপর্যায়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করে আইনি ব্যবস্থা দেখতে হবে।’

Link copied!