মঙ্গলবার ১৬, জুন ২০২৬

১৬ জুন ২০২৬, ০৮:৫০ পিএম

 সংসদে মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান জানানোর রীতি নিয়ে আপত্তি জামায়াত এমপির

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ জুন ২০২৬, ০৭:২৮ পিএম

1693

জাতীয় সংসদের মূল অধিবেশন কক্ষে প্রবেশের সময় স্পিকারের চেয়ারের অভিমুখে মাথা ঝুঁকিয়ে বা নিচু করে ঐতিহ্যগত সম্মান দেখানোর সংসদীয় রীতিতে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) মো. মুজিবুর রহমান। মাথা ঝুঁকিয়ে এমন সম্মান প্রদর্শন ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক এবং এটি ‘শিরকের’ পর্যায়ে চলে যায় বলে দাবি করেন তিনি।

আজ মঙ্গলবার (১৬ জুন) বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের অষ্টম দিনের শুরুতে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে জামায়াতের এই প্রবীণ নেতা ও সংসদ সদস্য এই ঐতিহাসিক আপত্তিটি উত্থাপন করেন।

সাধারণত দীর্ঘদিনের সংসদীয় রেওয়াজ অনুযায়ী, সংসদের মূল কক্ষে প্রবেশের সময় বা কক্ষ থেকে বের হওয়ার সময় সংসদ সদস্যরা স্পিকারের খালি বা পূর্ণ চেয়ারের দিকে মুখ করে মাথা কিছুটা নত করে সম্মান প্রদর্শন করেন। আবার অনেকেই দাঁড়িয়ে কেবল মৌখিক সালাম বিনিময় করেন।

আজ বৈঠকের শুরুতেই পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর পেয়ে জামায়াতের নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান অতীত কার্যপ্রণালি বিধির ইতিহাস টেনে বলেন, ‘বিগত ১৯৮৬ সালে যখন দেশের তৃতীয় জাতীয় সংসদ সচল ছিল, তখন সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে স্পষ্ট বলা ছিল সংসদের কক্ষে ঢোকার পর স্পিকারের আসনের প্রতি মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। কিন্তু পরবর্তীতে এই বিধিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী আনা হয়। কারণ, মাথা ঝুঁকিয়ে বা সিজদার ভঙ্গিতে সম্মান প্রদর্শন করা ইসলামের মূল আকিদার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক এবং এটি প্রকারান্তরে শিরকের পর্যায়ে চলে যায়। আর এই যৌক্তিক কারণেই সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি থেকে মাথা ঝুঁকানোর সেই নিয়মটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছিল।’

সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সরাসরি দৃষ্টি আকর্ষণ করে এমপি মুজিবুর রহমান আরও বলেন, ‘আমি সংসদে বসে মাঝেমধ্যে গভীরভাবে খেয়াল করি, আপনি নিজে অত্যন্ত সুন্দর ও চমৎকারভাবে হাত তুলে সবাইকে সালাম দেন। আমরাও আপনাকে সালাম দেই এবং সালামের জবাব আদান-প্রদান করি। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায়, অতীতে বাতিল হয়ে যাওয়া সেই মাথা ঝোঁকানোর পুরোনো রীতিটি এখনও অবলীলায় চর্চা করা হচ্ছে। মাননীয় স্পিকার, এই অবশিষ্টাংশ আপনার মাঝেও আছে, এমনকি মাননীয় ডেপুটি স্পিকারের মাঝেও লক্ষ্য করা যায়।’

সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী ‘শিরককে উৎখাত’ করার যে ধর্মীয় ও আইনি সংশোধন আনা হয়েছিল, তা সংসদের অভিভাবকসহ সকল সদস্যের অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলা উচিত বলে মন্তব্য করেন জামায়াত এমপি। তিনি আধ্যাত্মিক গুরুত্ব তুলে ধরে যোগ করেন, ‘আমরা যদি এই নিয়মের সঠিক প্রতিপালন করি, তবে এতে আমাদের নেকি বা পুণ্য হাসিল হবে, আমরা বড় গুনাহ ও পাপ থেকে বেঁচে থাকতে পারব এবং পরকালের কঠিন কাল-কেয়ামতেও এটা থেকে আমরা সবাই মহান আল্লাহর দরবারে বিশেষ উপকার লাভ করব।’

জামায়াত এমপির এমন স্পর্শকাতর ও ধর্মীয় আপত্তির জবাবে ডায়াসে বসা স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ অত্যন্ত শান্ত ও ইতিবাচক রুলিং দেন। তিনি বলেন, ‘মাননীয় সদস্য, আপনি যে কার্যপ্রণালি বিধির সংশোধনীর কথা উল্লেখ করেছেন, আমি নিজে সেই কার্যপ্রণালি বিধিটি গভীরভাবে দেখে এ বিষয়ে বিস্তারিত ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাব।’

তবে বিষয়টি যে বাধ্যতামূলক নয়, তা মনে করিয়ে দিয়ে স্পিকার আরও বলেন, ‘সংসদীয় রীতিনীতির বাইরেও এটি আসলে সবার জন্য সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় বিশ্বাসের একটি বিষয়। কেউ সম্মান প্রদর্শনের জন্য কেবল সালাম দেবেন, আবার কেউ দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক রীতির অংশ হিসেবে মাথা ঝোঁকাবেন। সারা পৃথিবীর বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশের সংসদেও এ রকম বৈচিত্র্যময় রীতিনীতি চালু আছে। তা সত্ত্বেও, আপনি যেহেতু পূর্ববর্তী সংসদের সংশোধনীর একটি আইনি বিষয় সামনে এনেছেন, তাই আমি নিজে লাইব্রেরি থেকে ফাইলপত্র দেখে পরীক্ষা করব যে—বিগত কোনো সংসদে এই মাথা ঝোঁকানোর নিয়মটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল বা সংশোধন করা হয়েছে কি না।’

Link copied!