সোমবার ২০, এপ্রিল ২০২৬

সোমবার ২০, এপ্রিল ২০২৬ -- : -- --

কর্মীর অবর্তমানে ডিজিটাল যমজই সামলাবে সব কাজ!

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৪০ পিএম

2004

মেটা তাদের প্রধান নিবার্হী মার্ক জাকারবার্গের এক এআই সংস্করণ তৈরি করছে এমন খবর এ প্রযুক্তির প্রতি মানুষের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

নিজেদের কর্মদক্ষতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে এখন তৈরি হচ্ছে মানুষের হুবহু এআই সংস্করণ বা ডিজিটাল টুইন।

রিচার্ড স্কেলেল্টের ‘ডিজিটাল রিচার্ড’ থেকে শুরু করে বড় বড় কোম্পানির ‘সুপারওয়ার্কার’ তৈরির এ প্রবণতা কর্মক্ষেত্রে বিপ্লব আনলেও এর মালিকানা ও আইনি দায়বদ্ধতা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।

‘ডিজিটাল রিচার্ড’ হচ্ছে একটি এআই টুইন, যা রিচার্ড স্কেলেল্ট গত তিন বছর ধরে তৈরি করছেন। স্ক্রিনের ভেতরে সীমাবদ্ধ ডিজিটাল রিচার্ডকে দেখতে অনেকটা দ্বিমাত্রিক মনে হলেও সে কোনো সাধারণ চ্যাটবট নয় বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।

রিচার্ড স্কেলেল্ট যা কিছু জানেন তার সবকিছুই ডিজিটাল রিচার্ড জানে। এ ডিজিটাল টুইন ‘স্মল ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ হিসেবে তৈরি হয়েছে, যা রিচার্ডের যাবতীয় মিটিং, কল, নথিপত্র ও প্রেজেন্টেশন বিশ্লেষণ করতে চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করেছে।

এরপর রিচার্ডের চিন্তাধারা ও সমস্যা সমাধানের পদ্ধতি অনুসরণের জন্য একে আরও উন্নত বা রিফাইন করা হয়েছে। এর চূড়ান্ত রূপটি হচ্ছে, একটি টেক্সটভিত্তিক উইন্ডো, যার সঙ্গে স্কেলেল্ট পরামর্শ করতে পারেন।


প্রযুক্তি বিষয়ক পরামর্শক কোম্পানি ‘ব্লর রিসার্চ’-এর চিফ অ্যানালিস্ট হিসেবে তার কাজ, ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত ও ক্লায়েন্টদের জন্য প্রেজেন্টেশন তৈরির ক্ষেত্রে এ বিষয়টি তাকে সাহায্য করে।

ডিজিটাল রিচার্ড স্কেলেল্টকে তার ব্যক্তিগত জীবন সামলাতেও সাহায্য করে। এতে ‘ফ্যামিলি’ ও ‘অ্যাডমিন’ লেবেলওয়ালা আলাদা ট্যাব রয়েছে, যা তার সহকর্মীদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত নয়। তবে সহকর্মীরা চাইলে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ডিজিটাল রিচার্ডকে প্রশ্ন করার সুযোগ পান।

‘ডিজিটাল রিচার্ড’ এখন এক ব্লুপ্রিন্ট বা আদর্শ হিসেবে কাজ করছে, যার ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে ছড়িয়ে থাকা ‘ব্লর রিসার্চ’-এর ৫০ সদস্যের পুরো দলের জন্য ডিজিটাল টুইন তৈরি করা হয়েছে।

যেমন, একজন অ্যানালিস্ট যিনি অবসরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন তিনি তার ডিজিটাল টুইনকে কাজের ভার দিয়ে পর্যায়ক্রমে অবসর নিতে পারছেন।

এ ছাড়া, মার্কেটিং টিমের কোনো সদস্য মাতৃত্বকালীন ছুটিতে গেলে কোম্পানি অস্থায়ী কোনো কর্মী নিয়োগ না দিয়ে তার ডিজিটাল টুইন ব্যবহার করতে পারে।

‘ব্লর রিসার্চ’ এ ডিজিটাল টুইন বিষয়টিকে বলছে ‘ডিজিটাল মি’। কোম্পানিতে নতুন যোগদানকারী যে কারো জন্য এটি সাধারণ এক সুবিধা হিসেবে যোগ হয়েছে। আরও ২০টি কোম্পানি এরইমধ্যে এ প্রযুক্তিটি পরীক্ষা করছে এবং বছরের শেষদিকে তা সবার জন্য উন্মুক্ত হবে।


স্কেলেল্ট বলেছেন, “বর্তমান পরিবেশে আপনি যদি কার্যকরভাবে কাজ করতে চান তবে একটি ‘ডিজিটাল মি’ থাকা আর ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয়। এমনটি আপনার কাজের ধরনেরই একটি অংশ হয়ে দাঁড়াবে।”


নিজের কোম্পানির প্রায় ৫০ জন কর্মীর জন্য ডিজিটাল টুইন তৈরি শুরু করেছেন ‘জশ বারসিন কোম্পানি’র প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও জশ বারসিন। ছবি: জশ বারসিন কোম্পানি


স্কেলেল্টের এ দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করছে প্রযুক্তি বিশ্লেষক কোম্পানি ‘গার্টনার’। তাদের পূর্বাভাস অনুসারে, রেকর্ডিং শিল্পীদের কণ্ঠ বা গায়কী নকলের জন্য এআই ব্যবহারের যে প্রবণতা শুরু হয়েছে তাকে অনুসরণ করে জ্ঞানভিত্তিক কর্মীদের এমন ডিজিটাল রেপ্লিকা বা অনুলিপি এ বছর থেকেই মূলধারায় আসতে শুরু করবে।


মেটা তাদের প্রধান নিবার্হী মার্ক জাকারবার্গের এক এআই সংস্করণ তৈরি করছে এমন খবরে এ প্রযুক্তির প্রতি মানুষের আগ্রহ আরও বাড়তে পারে।

যেসব কোম্পানি ডিজিটাল টুইন থাকা কর্মীদের বাড়তি কর্মসক্ষমতা থেকে মুনাফা করতে চায় তাদের কাছে এমনটি স্বপ্নের মতো মনে হতে পারে। তবে বর্তমানে এর পেছনে অনেক অমীমাংসিত প্রশ্ন রয়ে গেছে।

এআই ডিজিটাল টুইনের মালিক কে? নিয়োগকর্তা নাকি কর্মচারী? যেহেতু এরা বেশি কাজ করতে পারে ফলে যারা এটি ব্যবহার করছেন তাদের কি বেতন বেশি হওয়া উচিত? কারো ডিজিটাল টুইনের কোন অংশে কার প্রবেশাধিকার থাকা উচিত? আর যদি কোনো ডিজিটাল টুইন ভুল করে তবে তার দায়ভার কে নেবে?


‘গার্টনার’-এর মানবসম্পদ বিভাগের গবেষণা পরিচালক কেইলিন লোমাস্টার। কর্মক্ষেত্র ও কর্মীদের ওপর এআইয়ের প্রভাব নিয়ে কাজ করছেন তিনি।

লোমাস্টার বলেছেন, “অবশ্যই এর কিছু কার্যকর সুফল রয়েছে। তবে তা নির্ভর করছে সঠিক পরিচালনা পদ্ধতি, অবসর সময়ের সঠিক ব্যবহার ও এসব এজেন্টের স্বচালনার ওপর। এ ছাড়া আমার নাম, ছবি ও সাদৃশ্য যেন আমারই থাকে তা নিশ্চিত করা জরুরি। তবে আমার নিয়োগকর্তা এর থেকে লাভবান হচ্ছেন।

“আমার মনে হয়, আমরা সম্ভবত এই মুদ্রার ইতিবাচক দিকের চেয়ে নেতিবাচক দিকটিই আগে দেখতে পাব।”

মালিকানা ও বেতনের বিষয়ে ‘ব্লর রিসার্চ’-এর অবস্থান ‘খুবই স্পষ্ট’ বলে জানান স্কেলেল্ট। তার মতে, এআই ডিজিটাল টুইনের মালিকানা ব্যক্তির নিজের হওয়া উচিত, যাতে এর মাধ্যমে তৈরি হওয়া যে কোনো মূল্যের সুবিধা তিনি নিজেই পেতে পারেন। আর বিভিন্ন কোম্পানিকে তা ব্যবহারের জন্য অর্থ দিতে হবে।

‘ব্লর’-এর ক্ষেত্রে, কর্মীদের কাজের সময়ের বদলে তাদের কাজের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে বেতন দেওয়া হয়। ফলে ডিজিটাল টুইনের মাধ্যমে বেশি কাজের সুযোগ পাওয়ায় তারা আরও বেশি আয় করতে পারছেন।

স্কেলেল্ট বলেছেন, “এ কারণেই বর্তমানের পারিশ্রমিক কেবল বেতন আর বোনাসের মধ্যে সীমিত না থেকে কাজের ফলাফল, পরিমাপযোগ্য বাণিজ্যিক প্রভাব এবং ভ্যালু ক্রিয়েশনের প্রতিফলন ঘটায়। এআই কাজের সময় ও গতি বদলে দিচ্ছে। ফলে ঘণ্টার হিসেবে পারিশ্রমিক দেওয়ার পদ্ধতির ভবিষ্যৎ খুব একটা নেই।”

এইচআর লিডারদের জন্য পরামর্শক কোম্পানি ‘জশ বারসিন কোম্পানি’। স্যান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক স্টার্টআপ ‘ভিভেন’-এর তৈরি প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রায় এক বছর আগে নিজের এবং তার কোম্পানির প্রায় ৫০ জন কর্মীর জন্য ডিজিটাল টুইন তৈরি শুরু করেছেন কোম্পানিটির প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও জশ বারসিন।

এখন কোনো নির্দিষ্ট প্রজেক্ট বা ক্লায়েন্ট অ্যাকাউন্টের অবস্থা জানতে মিটিং, কল বা ইমেইলের প্রয়োজন হয় না, বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ডিজিটাল টুইনকে দ্রুত এক প্রশ্ন করেই তা জেনে নেওয়া যায়।

এআই একজন ব্যক্তির কর্মক্ষমতাকে যেভাবে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে সেটিকে বোঝাতে বারসিন ‘সুপারওয়ার্কার’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।

ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের বাসিন্দা বারসিন বলেছেন, “মানুষের এখন আর এটা-সেটা নিয়ে আলোচনার জন্য আরেকটি কনফারেন্স কলে যোগ দেওয়ার মতো শক্তি নেই। তবে আপনি চাইলে মাঝরাতেও ডিজিটাল টুইনকে জাগিয়ে তুলে এক ঘণ্টা কথা বলতে পারেন। এতে তার কিছু যায় আসে না। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।”

তার কোম্পানি বছরে প্রায় ৩০ শতাংশ হারে বড় হচ্ছে। তবে প্রত্যেকে তাদের ডিজিটাল টুইনের মাধ্যমে অনেক বেশি কর্মক্ষম হয়ে ওঠায় বারসিনকে বছরে কেবল দুইজনের মতো নতুন কর্মী নিয়োগ দিতে হয়। এর ফলে তিনি প্রতি বছর কর্মীদের বোনাসের পরিমাণ বাড়াতে পারছেন।

বারসিন বলেছেন, “প্রতিটি মানুষের অর্থনৈতিক মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। আপনি যদি কোম্পানির ডিজিটাল জগতের একজন মূল্যবান অংশ হয়ে ওঠেন তবে কোম্পানি আপনাকে কেন বেশি বেতন দেবে না?”

তবে ডিজিটাল টুইনের মালিকানার প্রশ্নে তার ও স্কেলেল্টের মতামতের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

বারসিন বলেছেন, “আমি নিশ্চিত যে বেশিরভাগ দেশের কর্মসংস্থান চুক্তিতে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ বা আপনার তৈরি করা তথ্য ব্যবসার সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয়, আপনার ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে নয়।

“তবে আপনি যদি যৌক্তিকভাবে ভাবেন, কেউ যখন কোম্পানি ছেড়ে চলে যায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার টুইন বা ডিজিটাল সংস্করণের গুরুত্ব কমতে থাকে। কারণ পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত বদলায়। তবে ওই টুইনটি আর আপডেট হয় না। ফলে কিছুদিন পর সেই টুইনটি কতটা কার্যকর থাকবে তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।”

ডিজিটাল টুইনগুলোকে কীভাবে সুনির্দিষ্ট নিয়মের অধীনে আনা যায় সে বিষয়ে শ্রম আইন কীভাবে আপডেট করা হবে তা নিয়ে আইনজীবীরা এখনও কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেননি।

‘বেলভিউ ল’-এর সহযোগী এবং শ্রম আইন ও বাণিজ্যিক বিরোধ নিয়ে কাজ করেন অঞ্জলি মালিক। তিনি বলেছেন, “যখনই কোনো এআই টুলকে একজন ব্যক্তির ইমেইল, মিটিং এবং কাজের ওপর ভিত্তি করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় তখন আপনি শ্রম সম্পর্কের একদম মূল বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছেন। যেমন, সম্মতি, ব্যক্তিগত তথ্যের নিয়ন্ত্রণ, কাজের দক্ষতা, শ্রমের বিকল্প ও কেউ চাকরি ছেড়ে চলে গেলে কী ঘটবে এসব বিষয় এখানে জড়িত।”

‘এভারশেডস সাদারল্যান্ড’-এর শ্রম আইন বিশেষজ্ঞ পার্টনার ক্লো থেমিস্টোক্লিয়াসের ধারণা, ডিজিটাল টুইন ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘সুস্পষ্ট সংবিধিবদ্ধ নির্দেশিকা’ থাকা অপরিহার্য। অন্যথায় নিয়োগকর্তা ও কর্মী উভয়কেই আইনি জটিলতার বড় ঝুঁকিতে পড়তে হবে।

তিনি বলেছেন, “বর্তমানে শ্রম আইনে এত বেশি পরিবর্তন আসছে যে, কেবল এআইয়ের জন্য আলাদা কোনো পরিবর্তন খুব দ্রুত আসার সম্ভাবনা কম। ফলে আইনগত সমাধান না আসা পর্যন্ত আপাতত ট্রাইব্যুনালগুলোকেই এসব জটিল বিষয় সামলাতে হতে পারে।”

এক্ষেত্রে একমত পোষণ করে ‘স্কয়ার ওয়ান ল’-এর পার্টনার ও শ্রম আইন বিভাগের প্রধান জিন-পিয়েরে ভ্যান জিল বলেছেন, এ প্রযুক্তির আইনি রূপরেখা তৈরিতে বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালই অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে।

“ভবিষ্যতে যদি এমন কোনো মামলা আসে, যেখানে একজন কর্মীকে তার এআই টুইনের কোনো কাজের জন্য শাস্তি দেওয়া হয়েছে বা বরখাস্ত করা হয়েছে তখনই সম্ভবত এ আইনের বিকাশ ঘটবে।

“সেক্ষেত্রে নিয়োগকর্তার আচরণ ন্যায়সঙ্গত ছিল কি না সে বিষয়ে ট্রাইব্যুনালকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”

Link copied!