প্রকাশিত: ১২ জুন ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম
1697
১৩ জুন ২০২৬, ১০:০০ এএম
বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল ব্যবস্থার ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ (কেন্দ্র ভাড়া) ইস্যুতে বর্তমান সরকারের আইনি ও কৌশলগত সীমাবদ্ধতার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেন, "ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে সাধারণ মানুষের যে ক্ষোভ, তা যৌক্তিক। তবে আমাদের বর্তমান বাস্তব অবস্থা ও সীমাবদ্ধতাও আপনাদের বুঝতে হবে। আমি যদি আজ জোর করে এই চার্জ দেওয়া বন্ধ করতে চাই, তবে তারা দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করে দেবে। আর তা হলে দেশজুড়ে আবারও তীব্র বিদ্যুৎ সংকট সৃষ্টি হবে, যা আমরা চাই না।"
আজ শুক্রবার (১২ জুন) বিকেলে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট-উত্তর ঐতিহ্যবাহী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে জ্বালানি মন্ত্রী এসব তথ্য জানান। এই মেগা সংবাদ সম্মেলনটি সঞ্চালনা করেন অর্থ সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার।
ক্যাপাসিটি চার্জ বহাল রাখার নেপথ্য কারণ ব্যাখ্যা করে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, "ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে দেশজুড়ে অনেক সমালোচনা ও আলোচনা হচ্ছে। আমি নিজেও দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এ বিষয়ে সরব হয়েছি। মূলত অতীতে বিনিয়োগকারীদের ব্যাংকযোগ্য (ব্যাংকেবল) করতে এবং রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির ভিত্তিতে দেশে বড় বড় বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র আনতে এই ক্যাপাসিটি চার্জের ফাঁদ বা ব্যবস্থা করা হয়েছিল।"
তিনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, "আমি দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন থেকেই এই ক্যাপাসিটি চার্জের চুক্তিগুলো নিয়ে বসেছিলাম। কিন্তু আগের পতিত সরকার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মালিকদের সঙ্গে যে চুক্তিগুলো করেছে, সেগুলো এতটাই ওয়ান-সাইডেড বা একতরফাভাবে বিনিয়োগকারীদের পক্ষে করা হয়েছে যে, সেখানে সরকারের আইনি সুরক্ষার পক্ষে কিছুই রাখা হয়নি। ফলে আমরা তাদের সঙ্গে একাধিকবার বসে চুক্তি সংশোধনের আলোচনা করলেও তারা কোনোভাবেই ক্যাপাসিটি চার্জের দাবি ছাড়তে রাজি হয়নি।"
মন্ত্রী বিনিয়োগকারীদের বরাতে বলেন, "বিনিয়োগকারীরা আমাদের সাফ জানিয়েছেন যে—এখন যদি হুট করে ক্যাপাসিটি চার্জ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে অর্থায়নকারী ব্যাংকগুলো তাদের দেওয়া হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ এককালীন ফেরত চাইবে, যা পরিশোধ করা তাদের পক্ষে অসম্ভব। আর ক্যাপাসিটি চার্জ না পেলে তাদের পক্ষে বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করাও সম্ভব হবে না।"
জ্বালানি খাতের বর্তমান ভয়াবহ বকেয়া ও সংকটের চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, "বিগত সরকারের আমলে দেশের নিজস্ব সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অনেকগুলোরই প্রয়োজনীয় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ (মেনটেইন্যান্স) করা হয়নি। সেগুলোকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বসিয়ে রেখে চড়া দামে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে। যার ফলে এই খাতে বর্তমানে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার বিশাল পাহাড়সম বকেয়া তৈরি হয়েছে। আপনাদের বুঝতে হবে, আগের ফ্যাসিস্ট সরকার এসব গণবিরোধী ব্যবস্থা করে গেছে। আমরা এখন কেবল তাদের রেখে যাওয়া এই বিশাল পাপ ও অর্থনৈতিক বোঝা বহন করছি।"
সাবেক সরকারের আমলের মেগা দুর্নীতির উদাহরণ হিসেবে পল্লি বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) পাঁচ লাখ ডিজিটাল মিটার ক্রয়ের একটি প্রকল্পের কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, "চুক্তি অনুযায়ী আড়াই লাখ মিটার ইতিমধ্যেই দেশে আনা হয়েছে, কিন্তু চরম অবহেলায় তিন বছরে মাত্র ৬৫টি মিটার স্থাপন করা গেছে! বাকি মিটারগুলো পল্লি বিদ্যুতায়ন বোর্ডের গুদামে পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে। এই স্থবিরতার মাঝেই আমাদের নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জানতে পারে, চুক্তি অনুযায়ী বাকি আড়াই লাখ মিটারও বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য ইতোমধ্যে রহস্যজনকভাবে জাহাজীকরণের (শিপমেন্ট) আদেশ দেওয়া হয়েছে।"
তিনি আইনি জটিলতার কথা উল্লেখ করে বলেন, "এখন যদি আমরা দেশের স্বার্থে এই ক্ষতিকর চুক্তি বাতিল করি, তবে তারা আন্তর্জাতিক আদালতে গেলে অনায়াসে জিতে যাবে। কারণ আমাদের আরইবি বোর্ড থেকেই তাদের মালামাল পাঠানোর লিখিত নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে আমরা চাইলেও সহজে এই চুক্তি বাতিল করতে পারছি না। এভাবেই সুপরিকল্পিত উপায়ে দেশ থেকে কোটি কোটি টাকা বের করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।"
সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির (ডিপিডিসি) আরেকটি বিতর্কিত প্রকল্পের চাঞ্চল্যকর তথ্য উল্লেখ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, "২০৪০ সাল পর্যন্ত রাজধানী ঢাকার বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকায়নের জন্য আন্ডারগ্রাউন্ড কেবলের (ভূগর্ভস্থ তার) একটি বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। সেখানে ৬৫টি অত্যাধুনিক সাবস্টেশন নির্মাণের কথা থাকলেও প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে মাত্র ৩৮টি সাবস্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। অথচ প্রকল্পের মূল মেয়াদের বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে শাহবাগের পেছনে ডিপিডিসির জন্য ‘টুইন টাওয়ার’ নির্মাণ করা হয়েছে! সেখানে আন্তর্জাতিক মানের সুইমিং পুল, জিমনেসিয়ামসহ বিলাসিতার বিভিন্ন সুবিধা রাখা হয়েছে। অথচ যে প্রতিষ্ঠানটি (ডিপিডিসি) এগুলো করেছে, তারা নিজেরা কোনো মুনাফা করে না এবং বছর বছর লোকসান হলে সাধারণ জনগণের ট্যাক্সের টাকায় সরকার তাদের হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়।"
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেন, "বিগত আমলের প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কোনো অংশের কাজ ৫০ শতাংশ, কোনো অংশের ৬০ শতাংশ, আবার কোনোটির মাত্র ৩০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। এখন দেশের টাকা বাঁচাতে আমরা যদি এগুলো মাঝপথে বন্ধ করে দিই, তবে ইতোমধ্যে ব্যয় হওয়া বিপুল অর্থের পুরোটাই রাষ্ট্রীয় অপচয় হবে। আবার বিপুল বকেয়া নিয়ে এগুলোকে চালিয়ে নেওয়াও বর্তমান সরকারের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।"
তিনি দেশবাসীর কাছে সময় প্রার্থনা করে বলেন, "বিগত সরকার চারদিকে যেভাবে সীমাহীন লুটপাট করে আমাদের জন্য একের পর এক মরণফাঁদ বা আত্মঘাতী প্যাকেজ রেখে গেছে, সেগুলো এখন আমাদের অত্যন্ত ধৈর্য ও কৌশলের সাথে সমাধান করতে হচ্ছে। আমরা মাত্র কয়েক মাস আগে দেশের দায়িত্ব নিয়েছি। এক দশকেরও বেশি সময়ের এই প্রাতিষ্ঠানিক জটলা ও পচন মোকাবিলা করতে কিছুটা সময় লাগবে। তাই আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে আমরা কিছুটা সময় চাই, যাতে আমরা এই জঞ্জালগুলো সঠিকভাবে ও স্থায়ীভাবে সমাধান করতে পারি।"