প্রকাশিত: ১২ জুন ২০২৬, ০৬:৩৩ পিএম
1699
১৩ জুন ২০২৬, ০৯:৫৬ এএম
কম্বোডিয়ার বিভিন্ন ভয়াবহ সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড (প্রতারণা কেন্দ্র) থেকে অলৌকিকভাবে উদ্ধার হওয়া ৩৭ জন ভাগ্যবিড়ম্বিত বাংলাদেশি নাগরিক অবশেষে অক্ষত অবস্থায় দেশে ফিরেছেন। বিদেশে অত্যন্ত লোভনীয় ও ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে পাচারকারী চক্র তাদের কম্বোডিয়ায় নিয়ে যায়। সেখানে তাঁদের পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে ‘সাইবার দাস’ (Cyber Slave) বানিয়ে দিনের পর দিন অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছিল। গতকাল বৃহস্পতিবার (১১ জুন) দিবাগত রাত ১টা ২৫ মিনিটে থাই এয়ারওয়েজের একটি বিশেষ ফ্লাইটে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান তারা।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম (BRAC Migration Program) নিশ্চিত করেছে যে, ফেরত আসা এই ৩৭ জন ভুক্তভোগীকে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পরপরই জরুরি মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সিলিং, খাবারসহ প্রাথমিক জরুরি সহায়তা এবং নিরাপদে নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় যাতায়াত বা অর্থ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
ভয়াবহ সেই দিনগুলোর স্মৃতি চারণ করে ফেরত আসাদের একজন ঢাকার শাহিনুর রহমান (ছদ্মনাম) জানান, দেশীয় দালাল চক্রের মাধ্যমে সরকারি সব বৈধ প্রক্রিয়াই সম্পন্ন করে ভালো তথ্যপ্রযুক্তি চাকরির প্রলোভনে তাঁদের কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। তবে কম্বোডিয়ার বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পরপরই সেখানকার স্থানীয় ও বাংলাদেশি আন্তর্জাতিক দালাল চক্র মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তাঁদেরকে চীনা নাগরিকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত দুর্ভেদ্য ও সশস্ত্র পাহারা বেষ্টিত বিভিন্ন সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে বিক্রি বা হস্তান্তর করে।
ফেরত আসা ভুক্তভোগীরা আরও জানান, এসব বন্দিশালা বা কম্পাউন্ডে তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ জোরপূর্বক আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারণামূলক ও জালিয়াতির কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে বাধ্য করা হতো। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও কানাডাসহ বিভিন্ন উন্নত দেশের ধনী নাগরিকদের টার্গেট করে ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ফেক ইনভেস্টমেন্টের সাইবার স্ক্যাম কার্যক্রমে অংশ নিতে তাঁদের ওপর রাতদিন চাপ প্রয়োগ করা হতো। পাচারকারীদের বেঁধে দেওয়া দৈনিক বা সাপ্তাহিক লক্ষ্য (টার্গেট) পূরণে সামান্য ব্যর্থ হলে তাঁদের ওপর নেমে আসতো ইলেকট্রিক শক ও অন্ধকার ঘরে আটকে রাখাসহ লোমহর্ষক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
সম্প্রতি কম্বোডিয়ার আন্তর্জাতিক চাপ ও নিজস্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক ও ধারাবাহিক চিরুনি অভিযানের ফলে দেশটির কয়েকটি বড় স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে এই বাংলাদেশিদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ দূতাবাসের অনবদ্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় তাঁদের ট্রাভেল পারমিট ইস্যু করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
উল্লেখ্য, এটিই প্রথম নয়; এর আগে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি মিয়ানমারের একটি কুখ্যাত সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে একইভাবে উদ্ধার হয়ে ৮ জন এবং গত ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর আরও ১৮ জন বাংলাদেশি নাগরিককে চরম নির্যাতনের পর দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। তাঁদেরকেও ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে থাইল্যান্ডে এবং পরবর্তীতে থাইল্যান্ডের দুর্গম সীমান্ত এলাকা ‘মায়েসট’ হয়ে নৌপথে জোরপূর্বক মিয়ানমারের বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত জোনে প্রবেশ করানো হয়েছিল। সেখানে পৌঁছানোর পরই তাঁদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে বিদেশের মাটিতে পরিবারের সাথে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ভয়াবহ দাসত্ব ও সাইবার জালিয়াতির কাজ করানো হতো।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, “বর্তমান বিশ্বে ‘সাইবার স্ক্যাম’ হলো আধুনিক মানবপাচারের সবচেয়ে ভয়াবহ ও আধুনিক একটি ডিজিটাল রূপ। আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্র কম্পিউটার অপারেটর, ডেটা এন্ট্রি, টাইপিস্ট, আইটি এক্সপার্ট কিংবা নামী দামি কলসেন্টার অপারেটরসহ বিভিন্ন পদে আকর্ষণীয় বেতনের প্রলোভন দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (যেমন: ভুয়া ওয়েবসাইট, লিঙ্কডইন, ই-মেইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ইত্যাদি) চটকদার বিজ্ঞাপন প্রচার করে। এরপর শিক্ষিত বেকার তরুণদের সুকৌশলে ট্যুরিস্ট বা বিজনেস ভিসায় সেই দেশের স্ক্যাম সেন্টারের ভেতরে নিয়ে যায় এবং অস্ত্রের মুখে জোরপূর্বক জিম্মি করে স্ক্যামের কাজে নিয়োজিত করে।”
তিনি দেশের তরুণ সমাজ ও অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে আইটি সেক্টরে ও আইটি রিলেটেড বৈদেশিক চাকরির ক্ষেত্রে কোনো সংস্থায় টাকা লেনদেনের পূর্বে সরকারের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET) থেকে কোম্পানির সত্যতা শতভাগ যাচাই করার জন্য জোর আহ্বান জানান।