প্রকাশিত: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:৫৩ পিএম
2009
শনিবার ১৮, এপ্রিল ২০২৬ -- : -- --
ছবি: সংগৃহীত
উদারপন্থি থেকে বামপন্থি কিংবা স্বতন্ত্র—বাংলাদেশের নির্বাচনি জনসংযোগে প্রার্থীদের পোশাকের পরিবর্তন এখন চোখে পড়ার মতো। টুপি, পাঞ্জাবি, ঘোমটা হয়ে উঠেছে তাদের প্রচারণার অন্যতম উপাদান।
কেবল পোশাক নয়, ধর্মকে ব্যবহার করে নির্বাচনি প্রচারণা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে পুরোনো। ধর্মভিত্তিক বা উদারপন্থি—দুটো দিকেই নজির রয়েছে। দেখা গেছে ধর্মভিত্তিক স্লোগান, পোস্টার, মাজার জিয়ারতকে নির্বাচনে ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে গণঅভ্যুত্থানের পর ‘নতুন বন্দোবস্তে’ ভোটাররা যে পরিবর্তনের আশা করেছিলেন, তা নির্বাচনি জনসংযোগে প্রতিফলিত হয়নি। বরং এবারের নির্বাচনে ধর্ম ব্যবহারের মাত্রা আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভোটারদের অজ্ঞতাই রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহারের মূল কারণ। (তানহা তাসনিম, বিবিসি বাংলা)
যদিও নির্বাচনি আচরণবিধিতে ধর্ম ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধ আছে। “কোনো প্রার্থী যদি সেই নির্দেশ অমান্য করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে জরিমানা ও শাস্তি রয়েছে।”
১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের জন্য আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হলেও প্রার্থীরা পূর্বেই নিজ নিজ আসনে জনসংযোগ শুরু করেছেন। মসজিদ বা শোকসভায় দেখা গেছে পুরুষরা টুপি-পাঞ্জাবি, নারী প্রার্থীরা ঘোমটা পরে জনসংযোগ করছেন। বিএনপি, এনসিপি, গণঅধিকার ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রায় সবাইকেই এই পোশাকে দেখা গেছে।
ঢাকার এমপি পদপ্রার্থী ও এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়েছেন। সম্প্রতি জনসংযোগের সময় একজন ধর্মীয় পোশাক পরা ব্যক্তি তার টুপি-পাঞ্জাবি পরার বিষয়ে প্রশ্ন করেন। ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
পাটওয়ারী বলেন,
"নির্বাচন এলে এটা থাকে। আর সমাজে যারা উপরস্থ, মসজিদ বা বাজার কমিটির সভাপতি, তাদের বয়স ৪০ থেকে ৫০ বছরের ওপরে থাকে। ফলে তারা ঐ সময় ধর্মচর্চা করেন এবং পাঞ্জাবি-টুপি পরেন। তো তাদের সাথে যখন কমিউনিকেশন হয়, তখন ওই ধরনের একটা কালচারাল জায়গা চলে আসে। যেহু এটা ৯০ পারসেন্ট মুসলমানের দেশ এবং ভোটার রেশিওটা মুসলমানদের মধ্যেই বেশি; তখন ওই ইস্যুটা চলে আসে।"
ধর্মভিত্তিক দলের নেতাদের অনেককে আগেই ধর্মীয় পোশাক পরতে দেখা গেছে। নির্বাচনি জনসংযোগে তাদের ধর্ম ব্যবহার আরও বেড়েছে—এমন অভিযোগও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন,
"নির্বাচন উপলক্ষে প্রচারণায় টুপির ব্যবহার বেড়েছে। এটা এ দেশে নতুন নয়। এতে যে কাজ হয় না, তা-ও তো বলা যায় না। নিশ্চয়ই কাজ হয়, না হলে এত স্মার্ট প্রার্থী এই কৌশল নেবেন কেন!"
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভোটারের অনেকেই পোশাক পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে নিচ্ছেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী শাজেদুজ্জামান সৌমিক বলেন,
"এটা হিপোক্রেসি হয়ে গেল না? সবার রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজি থাকে, সেখান থেকে কেউ যদি ফলো করে, সেটা বেটার। কিন্তু লেবাস পরে জান্নাতের টিকিট বিক্রি করা তো কাম্য নয়।"
নোয়াখালীর ব্যবসায়ী মোবারক মনে করেন,
"এটা আসলে লোক দেখানোর জন্য, নির্বাচন চলে গেলে তারা আগের লেবাসে চলে যায়।"
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মাহমা আলম শান্তা বলেন,
"কেউ যদি লেবাস ধারণ করে ভালো নির্বাচন করতে পারে, তাতে কোনো সমস্যা নেই।"
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এস এম শামীম রেজা বলেন,
"একটা হলো ক্লিন ইমেজ দেওয়া, কারণ অনেকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলের অভিযোগ আছে। এছাড়া ঋণখেলাপি, দুর্নীতি— এগুলো তো কমবেশি আছে।"
১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান ভাগ হওয়ায় ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতির সূচনা হয়। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর টুপি পরার রাজনৈতিক অভিষেক ১৯৩৭-এর নির্বাচনের পর।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ালী লীগের পোস্টারে লেখা ছিল,
"আল্লাহু আকবর, পাকিস্তান জিন্দাবাদ, আওয়ামী লীগ জিন্দাবাদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব – জিন্দাবাদ।"
১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে জনসভা শেষে শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন,
"নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর।"
স্বাধীনতার পর ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ হলেও ১৯৭৫ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা হয়। জিয়াউর রহমান সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার স্থলে
"সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর চূড়ান্ত আস্থা এবং বিশ্বাস" সংযোজন করেন, যা সংবিধানের ইসলামিকরণ শুরু করে।
এরশাদ ১৯৮৮ সালে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেন। ১৯৯১ সালে বিএনপি ধর্মকে নির্বাচনে ব্যবহার করে শাহজালালের মাজার জিয়ারত করে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগও ধর্ম ব্যবহার করে।
২০২৩ সালে ইসলামী আন্দোলনের মেয়র প্রার্থী সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম বলেন,
"আপনি যদি হাতপাখা প্রতীকে ভোট দেন, তাহলে ভোটটা পাবে ইসলাম এবং আল্লাহর নবী।"
সিলেটে একই বছর শেখ হাসিনা বলেন,
"এই নৌকা নূহ নবির নৌকা।"
তবে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, ভোটের নামে
"জান্নাতের টিকিট বিক্রি"।
দলটির আমির শফিকুর রহমান সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন:
"আমরা ধর্মকে কখনই ব্যবহার করি নাই, করবো না।"
সূত্র: দৈনিক আমার দেশ