রবিবার ১৪, জুন ২০২৬

১৪ জুন ২০২৬, ০৩:৩৫ পিএম

ইংলিশ চ্যানেলে রাশিয়ার তেলবাহী ট্যাঙ্কার আটক করল যুক্তরাজ্য

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ জুন ২০২৬, ০১:৩০ পিএম

1694

আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমার কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইংলিশ চ্যানেলে (English Channel) রাশিয়ার কুখ্যাত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছায়া বহরের একটি বিশাল তেলবাহী ট্যাঙ্কার হানা দিয়ে আটক করেছে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী। আজ রোববার (১৪ জুন) ভোররাতে এক ঝটিকা ও শ্বাসরুদ্ধকর যৌথ সামরিক অভিযান চালিয়ে অত্যন্ত গোপনে চলাচল করা এই রুশ তেলবাহী জাহাজটিকে আটক করা হয়। সকালে ডাউনিং স্ট্রিট থেকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই সফল অভিযানের কথা নিশ্চিত করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার।

টানা দীর্ঘ ছয় ঘণ্টা ধরে চলা এই হাই-প্রোফাইল সামরিক অভিযানে ব্রিটেনের এলিট ফোর্স ‘রয়্যাল মেরিন কমান্ডো’ এবং ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির (NCA) বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দুর্ধর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেন। পুরো অপারেশনটিতে আকাশপথ থেকে ব্যাক-আপ ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সরাসরি সহায়তা প্রদান করেছে ব্রিটিশ বিমান বাহিনী ‘রয়্যাল এয়ার ফোর্স’ (RAF)।

যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের (MoD) পক্ষ থেকে জারিকৃত এক বিশেষ বিবৃতিতে বলা হয়েছে—আটককৃত রুশ তেলবাহী মেগা ট্যাঙ্কারটির নাম **‘স্মায়রটস’ (Smyrots)**। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তেল পরিবহনের অভিযোগে জাহাজটির বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ আইনি ও ফরেনসিক তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিশালাকার এই ট্যাঙ্কারটিকে ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলের একটি সুরক্ষিত সামরিক ডকইয়ার্ডে আটকে রাখা হবে এবং বিশেষ কমান্ডো বাহিনীর মাধ্যমে এটিকে সার্বক্ষণিক নিবিড় নজরদারিতে (Under Strict Observation) রাখা হবে।

এই সফল অভিযানের পর কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, “ইংলিশ চ্যানেলের এই সফল যৌথ অভিযানটি ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থায়ন বন্ধে রাশিয়ার বিরুদ্ধে আমাদের আরও একটি বড় ও কার্যকর আঘাত। ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ধ্বংস করতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের অবৈধ যুদ্ধে যারা চোরাগোপ্তা উপায়ে অর্থ ও জ্বালানির ইন্ধন জোগাচ্ছে, তাদের জন্য এটি একটি চূড়ান্ত সতর্কবার্তা। আমরা স্পষ্ট করে বলে দিতে চাই—আন্তর্জাতিক অপরাধ করে তারা বিশ্বের কোথাও লুকিয়ে থাকতে পারবে না।”

এদিকে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ড্যান জার্ভিস এই অভিযানের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “রাশিয়া আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে এ ধরনের গোপন শ্যাডো ফ্লিটের মাধ্যমে অর্জিত শত শত কোটি কালো টাকা সরাসরি ইউক্রেন যুদ্ধে বোমাবর্ষণের কাজে ব্যয় করছে। এই জাহাজটি জব্দ করা পুতিনের যুদ্ধ পরিচালনার ব্যাকবোন বা অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডের জন্য একটি বড় ধরনের বড় আঘাত।”

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—রুশ ট্যাঙ্কারটিকে মাঝসমুদ্রে নিখুঁতভাবে ট্র্যাকিং ও কর্ডন করতে রয়্যাল নেভির বিশেষ মেরিটাইম এয়ার গ্রুপ, রয়্যাল এয়ার ফোর্সের অত্যাধুনিক পি-৮ পসাইডন (P-8 Poseidon) সাবমেরিন শিকারি বিমান এবং ব্রিটেনের শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ ‘এইচএমএস সাদারল্যান্ড’ (HMS Sutherland) ও ‘এইচএমএস লেডবেরি’ (HMS Ledbury) সরাসরি অংশ নেয়।

ইউক্রেন আক্রমণের পর রাশিয়ার ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। রাশিয়া সেই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এবং অবৈধভাবে অপরিশোধিত তেল বিশ্ববাজারে রপ্তানি করার জন্য শত শত পুরনো জাহাজের এই ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছায়া বহর গড়ে তুলেছে। এই জাহাজগুলোর অধিকাংশেরই কোনো বৈধ আন্তর্জাতিক বিমা বা সঠিক মালিকানার কাগজপত্র থাকে না।

যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গোপন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রাশিয়ার রপ্তানি করা তেলের প্রায় ৭৫ শতাংশই এই সাত শতাধিক জাহাজের বিশাল ছায়া বহর বিশ্বজুড়ে পরিবহন করে আসছে। এটি বর্তমানে ক্রেমলিনের যুদ্ধকালীন অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি লাইফলাইন বা মাধ্যম। এই অর্থনৈতিক রুট বন্ধ করতে যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যে রাশিয়ার এই গোপন বহরের ৫০০টিরও বেশি জাহাজকে কঠোর কালো তালিকাভুক্ত ও নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছে।

Link copied!