সোমবার ১৫, জুন ২০২৬

১৫ জুন ২০২৬, ০৮:৩০ পিএম

বাজেটে সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ, ডিসি নিয়োগে ক্ষোভ রুমিন ফারহানার

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ জুন ২০২৬, ০৭:০১ পিএম

1693

জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনা চলাকালে ক্ষুরধার ও অত্যন্ত সরব ভূমিকা পালন করেছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। অধিবেশনের এক পর্যায়ে প্রশ্নোত্তর পর্বে কথা বলার সুযোগ না পেয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং জেলা প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে খোদ মন্ত্রীর সামনেই নিজের তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন স্বতন্ত্র এই সাংসদ। একই সঙ্গে দেশের চলমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকট ও নতুন বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে অর্থমন্ত্রীর মেধা ও কৌশল নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

আজ সোমবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন চলাকালে ২০২৫ এবং ২০২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটে সম্পূরক মঞ্জুরি দাবির ওপর দেওয়া ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই রাজনৈতিক আক্রমণ করেন।

স্পিকার প্রথমে রুমিন ফারহানাকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় নিয়ে কথা বলার আহ্বান জানালে তিনি আকস্মিকভাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বক্তব্য শুরু করেন। স্পিকার তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে থামিয়ে দিয়ে স্মরণ করিয়ে দেন যে এখন কেবল পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আলোচনার নির্ধারিত সময় চলছে এবং এটি কোনো প্রশ্নোত্তর পর্ব নয়। জবাবে রুমিন ফারহানা বলেন যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীকে তিনি আজ সামনে পেয়েছেন এবং পরে আর ওনাকে এভাবে পাবেন কি না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন যে সংসদে সাধারণ প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রশ্ন জমা দিলেও তা তালিকায় আসে না এবং সম্পূরক প্রশ্নের জন্য হাত তুললেও কথা বলার সুযোগ মেলে না। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়েই তিনি ছাঁটাই প্রস্তাবের মূল্যবান সময়কে কাজে লাগিয়ে মন্ত্রীর কাছ থেকে সরাসরি জবাব চান।

স্পিকার তখন তাঁকে বিকল্প প্রস্তাব দিয়ে বলেন যে তিনি চাইলে এখনই পানিসম্পদ বাদ দিয়ে কেবল স্থানীয় সরকার নিয়ে বলতে পারেন তবে সেই ক্ষেত্রে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় নিয়ে কথা বলার সুযোগ চিরতরে হারাবেন। রুমিন ফারহানা এই সুযোগ লুফে নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবেই বক্তব্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং নির্ধারিত তিন মিনিটের মধ্যে নিজের দাবি ও ক্ষোভ তুলে ধরেন।

সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা তাঁর বক্তব্যে সরাসরি অভিযোগ করেন যে সম্প্রতি দেশের জেলাগুলোতে যে জেলা প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তার প্রতিটিই সম্পূর্ণ দলীয় বিবেচনায় বা মনোনীত করা হয়েছে। তিনি বলেন যে দেশের মানুষ গত ১০ বছর ধরে গণতন্ত্রের জন্য নিরবচ্ছিন্ন লড়াই সংগ্রাম করেছে অথচ বর্তমান নতুন সরকার গঠনের প্রায় চার মাস পার হয়ে গেলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট তথ্য বা রূপরেখা পাওয়া যাচ্ছে না। সংবিধান অনুযায়ী স্থানীয় পর্যায়ের আসল শাসন ব্যবস্থা নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের হাতে থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে প্রতিটি জেলা একচ্ছত্রভাবে ডিসিদের অধীনে শাসিত হচ্ছে যা সরাসরি দেশের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে তিনি দাবি করেন। একই সঙ্গে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিষিদ্ধ ঘোষিত দল আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারবে কি না তা নিয়ে বাজারে নানা ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি এই বিষয়ে মন্ত্রীর কাছ থেকে স্পষ্ট অবস্থান জানতে চান।

এছাড়া দেশের অর্থনৈতিক খাতের ওপর গভীর আলোকপাত করে রুমিন ফারহানা এই তীব্র সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে অর্থমন্ত্রী কী করে বিশাল এই বাজেট বাস্তবায়ন করবেন সেই মৌলিক প্রশ্ন তোলেন। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন যে বাংলাদেশের জিডিপির আকার ৬৮ লাখ কোটি টাকা হলেও প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩.৪৯ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি বর্তমানে ৯.৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। খেলাপি ঋণ মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে যার আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে মূলধনের পর্যাপ্ততা এখন ঋণাত্মক ২.৬৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ২২ শতাংশ থেকে আশঙ্কাজনকভাবে নেমে মাত্র ৫ শতাংশে এসে ঠেকেছে। এছাড়া বাণিজ্য ঘাটতি ২২.২১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়া মূলত দেশের রফতানির চরম হ্রাস এবং আমদানির অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধিকেই নির্দেশ করে।

শ্বেতপত্রের তথ্য ও গ্লোবাল ফাইনান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির আন্তর্জাতিক বরাতের কথা উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা আরও বলেন যে বাংলাদেশ থেকে গত ১৫ বছরে অবৈধভাবে পাচার হয়ে গেছে মোট ২৩৪ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ প্রতি বছরে প্রায় ১৪ থেকে ১৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। অন্যদিকে ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের জঘন্য মাধ্যমে বছরে আরও আট বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে বাইরে চলে গেছে। বিগত ১৫ বছরে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোকে পুরোপুরি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে দৃশ্যমান কোনো ব্যবসা নেই এমন লোকদের দেদারসে ঋণ দেওয়া হয়েছে এবং নির্দিষ্ট কিছু পরিবারের হাতে দেশের ব্যাংকগুলোকে একটির পর একটি তুলে দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ব্যাংকের সুদহার ও ডলারের দাম জোর করে ঠিক করা হয়েছে এবং ডলারের ওপর চাপ কমাতে দাম দীর্ঘদিন ধরে রাখা হলেও প্রায় ১৮ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার এই খাত থেকে বিদেশে চলে গেছে।

তিনি অত্যন্ত সতর্ক করে বলেন যে দেশের শেয়ার বাজার এবং কর ব্যবস্থাপনা দ্রুত উন্নত না হলে পুরো চাপ গিয়ে পড়বে ভঙ্গুর ব্যাংক খাতের ওপরে। ঘাটতি বাজেট সংস্কৃতির কথা উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা বলেন যে এই বিশাল ঘাটতি পূরণ হয় সাধারণত দেশের ব্যাংক কিংবা বিদেশি ঋণ বা অনুদানের মাধ্যমে। কিন্তু দেশের ব্যাংক খাত যেখানে অলরেডি খেলাপি ঋণে পুরোপুরি জর্জরিত সেখানে তারা ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের জন্য নতুন করে কোনো ঋণ দেওয়ার অবস্থায় নেই। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সম্প্রতি জানিয়েছে যে তারা বাংলাদেশে ঋণের চুক্তির পরবর্তী কিস্তিগুলো বর্তমান নতুন সরকারকে আর সহজে দেবে না এবং নতুন করে চুক্তি করতে বলছে। ফলে এখন ঋণের জন্য আমাদের চীন বা এই রকম কোনো দেশের দিকে এককভাবে তাকাতে হবে।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও বিশ্বব্যাংক কিংবা আইএমএফ এর বাইরে গিয়ে যখন কোনো ভিন্ন দেশ থেকে দ্বিপাক্ষিক ঋণ নেওয়া হয় তখন সুদের হার অনেক বেশি থাকে এবং খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে সেটি পরিশোধেরও একটা বড় আন্তর্জাতিক চাপ থাকে। এই তীব্র সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে অর্থমন্ত্রী কীভাবে এই বিশাল বাজেট বাস্তবায়ন করবেন এবং সরকারের পরিচালন ব্যয়ের জন্য চাওয়া বিশাল অঙ্কের টাকা ঠিক কোথা থেকে আসবে তা নিয়ে তিনি নিজের তীব্র সংশয় প্রকাশ করেন।

Link copied!