শনিবার ১৩, জুন ২০২৬

১৩ জুন ২০২৬, ০৯:৫৭ এএম

ঋণনির্ভর উচ্চাভিলাষী লুটপাটের বাজেট পেশ করেছে সরকার: জামায়াত

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২ জুন ২০২৬, ০৩:৪৬ পিএম

1698

মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রতিক্রিয়া নিয়ে সংবাদ সম্মেলন

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে চরম ঋণনির্ভর, উচ্চাভিলাষী, অবাস্তবায়নযোগ্য এবং ‘লুটপাটের বাজেট’ বলে আখ্যায়িত করেছে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের মানুষ একটি জনবান্ধব ও দূরদর্শী বাজেট প্রত্যাশা করলেও, ঘোষিত বাজেটে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং জীবনমান উন্নয়নের কোনো সুস্পষ্ট বার্তা বা প্রতিফলন নেই।

আজ শুক্রবার (১২ জুন) দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে দলের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত বাজেটের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় এসব কথা বলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার।

সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেটটি মূলত ব্যাংক খাত ও বৈদেশিক বিরাট ঋণের ওপর বিপজ্জনকভাবে নির্ভরশীল। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেটের বিপরীতে ৬ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকার যে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, সেই কর কীভাবে আদায় করা হবে তা একেবারেই স্পষ্ট নয়। এছাড়া ২ লাখ ৩৬ হাজার ২৫০ কোটি টাকার যে বিশাল বাজেট ঘাটতি, তা পূরণ করার বাস্তব উৎসও উল্লেখ করা হয়নি। ঘাটতি মেটাতে সরকার যদি ব্যাংকিং খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়, তবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ স্থবির হয়ে পড়বে; যার ফলে দেশে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্পূর্ণ বাধাগ্রস্ত হবে।

বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তিনটি প্রধান বাধার কথা উল্লেখ করে জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, প্রথমত—বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং বারবার মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন খাতের খরচ বাড়িয়ে দেবে। দ্বিতীয়ত—লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, যা কমার কোনো লক্ষণ নেই। এবং তৃতীয়ত—বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। এই চ্যালেঞ্জগুলোর কারণে বাজেটের লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব হয়ে পড়বে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "বর্তমান সরকারের গৃহীত এসব অপরিণামদর্শী অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত আমাদের পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের গণবিরোধী নীতির কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।"

সংবাদ সম্মেলনে সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে তৈরি করা ‘ছায়া বাজেটে’র একটি সংক্ষিপ্ত তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়:

সরকারি বাজেট বনাম জামায়াতের ছায়া বাজেট

সূচক বা খাত | সরকারি প্রস্তাবিত বাজেট | জামায়াতের ছায়া বাজেট |
বাজেটের মোট আকার | ৯,৩৮,০০০ কোটি টাকা | ৮,৩৯,৫০৫ কোটি টাকা |
রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা | ৭,০১,১৫০ কোটি টাকা | ৬,৬৫,৯২৬ কোটি টাকা |
বাজেট ঘাটতির পরিমাণ | ২,৩৬,৪৫০ কোটি টাকা | ১,৬৮,৩২৯ কোটি টাকা |
জিডিপির অনুপাতে ঘাটতি | ৩.৫% | ২.৪৩% |
করমুক্ত আয়ের সীমা | ৩,৭৫,০০০ টাকা (অপরিবর্তিত) | ৪,৫০,০০০ টাকা (প্রাথমিক প্রস্তাব) |

জামায়াত নেতা বলেন, সরকার আমাদের চেয়ে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায়ের অবাস্তব লক্ষ্য ধরেছে। অন্যদিকে আমাদের প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি অনেক কম হওয়ায় অর্থনৈতিক ঝুঁকিও কম। এছাড়া জামায়াত আমির অর্থবছর পরিবর্তনের একটি যুগান্তকারী প্রস্তাব দিয়েছেন; যেখানে জুলাই-জুন মেয়াদের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বর ভিত্তিক ‘ক্যালেন্ডার বছর’ অনুযায়ী অর্থবছর চালুর দাবি করা হয়েছে। এর ফলে বর্ষা মৌসুমে তড়িঘড়ি করে উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ করার নামে অর্থ অপচয় ও ঠিকাদারদের পকেট ভারী করার দুর্নীতি বন্ধ হবে।

মিয়া গোলাম পরওয়ার সরকারের কর নীতির সমালোচনা করে বলেন, ন্যূনতম ব্যক্তিগত করের হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণ এবং পেট্রোলিয়াম, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পের কাঁচামালের ওপর ভ্যাট-শুল্ক বৃদ্ধি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে। এছাড়াও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ৩ লাখ কোটি টাকা করা হলেও জবাবদিহিতা না থাকায় তা অপচয়ের ক্ষেত্র তৈরি করবে। আইএমএফ যেখানে দেশের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে, সেখানে বাজেটে প্রবৃদ্ধি ৬.৫% এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫% এর লক্ষ্য ধরা সম্পূর্ণ কাল্পনিক।

ব্যাংকিং খাতের চরম নৈরাজ্যের চিত্র তুলে ধরে সাবেক এই সংসদ সদস্য বলেন, "ব্যাংক রেজোলিউশন আইন করে জনগণের অর্থ লুটপাট, কালো টাকা পাচার এবং ব্যাংকিং খাতকে পঙ্গু করার যে প্রক্রিয়া চলছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আমিরে জামায়াত (ডা. শফিকুর রহমান) সংসদে স্পষ্ট দাবি তুলেছেন—যাদের শেয়ার জোরপূর্বক কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তা অবিলম্বে ফেরত দিতে হবে। রাজনৈতিক পছন্দ অনুযায়ী ব্যাংকের শীর্ষ পদে নিয়োগ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা হরণ করা হচ্ছে।"

তিনি অবিলম্বে বাজেটে কালো টাকা সাদা করার অনৈতিক সুযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করার দাবি জানান এবং আগামী ৩০ জুনের আগে এই ‘গণবিরোধী ও উচ্চাভিলাষী’ বাজেট সংশোধন করে বিনিয়োগবান্ধব ও জনকল্যাণমুখী করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান। সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম ও ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদসহ ঢাকা মহানগরী উত্তর ও দক্ষিণের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

Link copied!