রবিবার ১৪, জুন ২০২৬

১৪ জুন ২০২৬, ০৬:৪৬ পিএম

সুইজারল্যান্ডে হচ্ছে জনসংখ্যা সীমিত রাখার গণভোট

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ জুন ২০২৬, ০৪:২৪ পিএম

1690

ইউরোপের অন্যতম সমৃদ্ধ ও ছবির মতো সুন্দর দেশ সুইজারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণে আজ রোববার (১৪ জুন) দেশটিতে এক ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন গণভোট (Referendum) অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই বিতর্কিত ভোটটি যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের সমর্থনে পাস হয়, তবে আইনি বাধ্যবাধকতার মাধ্যমে দেশটির সর্বোচ্চ মোট জনসংখ্যা ১ কোটির (১০ মিলিয়ন) মধ্যে সীমিত রাখা হবে।

সুইজারল্যান্ডের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে তুমুল ঝড় তোলা এই গণভোটটির মূল নেপথ্য পরিকল্পনাকারী এবং প্রকাশ্য সমর্থনকারী হচ্ছে দেশটির বৃহত্তম উগ্র-ডানপন্থি রাজনৈতিক দল ‘সুইস পিপলস পার্টি’ (SVP)।

উদ্যোক্তাদের মতে, এই গণভোটের প্রধান লক্ষ্য হলো সুইজারল্যান্ডে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অস্বাভাবিক ও দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনা। এর মাধ্যমে দেশের আবাসন খাত (Housing), ট্রেন ও গণপরিবহন ব্যবস্থা, উন্নত সরকারি সেবা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত মানবিক চাপ কমানো সম্ভব হবে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত ২০০২ সাল থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যা ৭৩ লাখ থেকে লাফিয়ে বেড়ে বর্তমানে ৯১ লাখে পৌঁছেছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বর্তমান জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশই বিশ্বের অন্য দেশ থেকে আসা অভিবাসী (Immigrants)। অতিরিক্ত জনসংখ্যার কারণে দেশটির সাধারণ জনগণ বর্তমানে ট্রেনের মতো গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভিড় এবং লাগামহীন বাসা ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে তীব্র সামাজিক উদ্বিগ্নতায় ভুগছেন। একই সাথে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার (Healthcare) আকাশচুম্বী ব্যয় বৃদ্ধিও সাধারণ সুইস নাগরিকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।

অন্যদিকে, এই গণভোটের তীব্র বিরোধীতাকারীরা স্পষ্ট বলছেন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের এই স্লোগানটি মূলত একটি প্রচ্ছন্ন ‘অভিবাসী বিরোধী’ (Anti-immigrant) নোংরা রাজনৈতিক কর্মসূচি ছাড়া আর কিছুই নয়। সুইজারল্যান্ডের বর্তমান ফেডারেল সরকার, দেশের সিংহভাগ মূলধারার রাজনৈতিক দল, শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতা এবং প্রভাবশালী ট্রেড ইউনিয়নগুলো এই গণভোটের বিপক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছে।

ব্যবসায়ী ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যদি এই ভোট শেষ পর্যন্ত পাস হয় এবং কঠোর আইনের মাধ্যমে জনসংখ্যা ১ কোটিতে আটকে দেওয়া হয়, তবে সুইজারল্যান্ডের জাতীয় অর্থনীতিতে ধস নামবে। বিশেষ করে দেশের হাসপাতাল (চিকিৎসা খাত), পর্যটন ও হোটেলের মতো প্রধান সেবাখাতগুলোতে মারাত্মক ‘শ্রমিক সংকট’ (Labor Shortage) দেখা দেবে, যা বাইরের দক্ষ কর্মী ছাড়া সচল রাখা অসম্ভব।

এছাড়া এই উগ্র-ডানপন্থি উদ্যোগটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) সঙ্গেও সুইজারল্যান্ডের সুদীর্ঘকালের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক চিরতরে খারাপ করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, সুইজারল্যান্ড আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ নয়; তবে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে তারা এই প্রভাবশালী জোটের সঙ্গে অত্যন্ত চমৎকার অর্থনৈতিক ও মুক্ত-যাতায়াত সম্পর্ক তৈরি করেছে।

গণভোটের বিরোধিতাকারীরা ভোটারদের সচেতন করতে এক অভিনব ও আক্রমণাত্মক প্রচার কৌশল বেছে নিয়েছেন। তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মতো একনায়কতান্ত্রিক ও কট্টরপন্থী বিশ্বনেতাদের ছবি ব্যবহার করে পোস্টার সেঁটেছেন। তাদের হুঁশিয়ারি—এই গণভোট পাস হলে সুইজারল্যান্ড কার্যত বৈশ্বিক ও ইউরোপীয় পরিমণ্ডল থেকে সম্পূর্ণ ‘বিচ্ছিন্ন ও একাকী’ হয়ে পড়বে।

সুইজারল্যান্ডের অনন্য ‘সরাসরি গণতন্ত্র’ (Direct Democracy) কাঠামোর নিয়ম অনুযায়ী, দেশের যেকোনো নাগরিক যদি কোনো জাতীয় ইস্যুতে গণভোট আয়োজন করতে চান, তবে আইনগতভাবে দেশজুড়ে মাত্র ১ লাখ (১০০,০০০) প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে পারলেই তা বাধ্যতামূলক সরকারি গণভোটে রূপ নেয়।

ভোটগ্রহণের ঠিক আগমুহূর্তে প্রকাশিত সর্বশেষ জাতীয় জনমত জরিপে (Polls) দেখা গেছে, দেশের ৫২ শতাংশ নাগরিক এই জনসংখ্যা সীমিতকরণের প্রস্তাবের সরাসরি বিরোধিতা করেছেন। অন্যদিকে প্রস্তাবের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন ৪৫ শতাংশ ভোটার। তবে একটি বিশাল বড় অংশের ভোটার এখনো ‘দোদুল্যমান’ বা অনির্ধারিত (Undecided) অবস্থায় রয়েছেন, যারা পক্ষে নাকি বিপক্ষে ভোট দেবেন তা শেষ মুহূর্তে নির্ধারণ করবেন। ফলে আজকের এই হাই-ভোল্টেজ গণভোটের চূড়ান্ত ফলাফল কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে পুরো ইউরোপজুড়ে গভীর কৌতুহল তৈরি হয়েছে।

Link copied!