প্রকাশিত: ২২ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৪০ এএম
1699
০১ মে ২০২৬, ০৭:২১ পিএম
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর দেশে রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। তবে সেই দাবির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রস্তাব, মতপার্থক্য এবং দর-কষাকষির মধ্য দিয়ে সংস্কার আলোচনা এগিয়েছে। বিশেষ করে উচ্চকক্ষ গঠন, গণভোট এবং জুলাই জাতীয় সনদকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্টি হয়েছে নানা মতভেদ।
সংবিধান সংস্কার কমিশন সংসদকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করার প্রস্তাব দেয়, যেখানে একটি উচ্চকক্ষ (সিনেট) থাকবে। এর উদ্দেশ্য ছিল নিম্নকক্ষে ক্ষমতাসীন দলের একচ্ছত্র প্রভাব কমিয়ে ভারসাম্য তৈরি করা। বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল এ ধারণাকে সমর্থন করলেও উচ্চকক্ষের গঠনপদ্ধতি ও ক্ষমতা নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়।
কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচন হবে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (PR) পদ্ধতিতে। অর্থাৎ জাতীয় নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে দলগুলো আসন পাবে। অন্যদিকে বিএনপি চেয়েছে, নিম্নকক্ষে অর্জিত আসনের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন হোক। এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিই মূল বিতর্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
উচ্চকক্ষের ক্ষমতা নিয়েও নানা আলোচনা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, অর্থবিল ছাড়া অন্য সব বিল উভয় কক্ষে উপস্থাপন করতে হবে। উচ্চকক্ষ বিল স্থায়ীভাবে আটকে রাখতে পারবে না, তবে সংশোধনের সুপারিশ করতে পারবে। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব থাকলেও এতে বিএনপি আপত্তি জানিয়েছে।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রস্তাবের পেছনে যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, এককক্ষবিশিষ্ট বর্তমান ব্যবস্থায় কার্যকর তদারকি, জবাবদিহি ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। নির্বাহী বিভাগের প্রভাব বৃদ্ধি এবং বিরোধী দলের অনুপস্থিতির কারণে সংসদের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা নিয়েও সংস্কার প্রস্তাবে পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও রাজনৈতিক দলের প্রধান থাকতে পারবেন না। যদিও এ বিষয়ে কিছু রাজনৈতিক দল দ্বিমত পোষণ করেছে। এছাড়া নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমিয়ে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। এতে এককভাবে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের পরিবর্তে মন্ত্রিসভার অনুমোদন প্রয়োজন হবে এবং বিরোধী দলের প্রতিনিধির উপস্থিতি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়ার প্রস্তাব থাকলেও এ ক্ষেত্রেও সব দল একমত হয়নি।
সংসদে জবাবদিহি বাড়াতে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়। এতে সংসদ সদস্যদের নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রেও কিছু রাজনৈতিক দলের ভিন্নমত রয়েছে।
নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর বিষয়টি প্রায় সব দল সমর্থন করলেও নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। প্রাথমিকভাবে নারী আসন বাড়ানো ও সরাসরি নির্বাচনের প্রস্তাব থাকলেও শেষ পর্যন্ত এ বিষয়ে ঐকমত্য হয়নি। ধাপে ধাপে নারী প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের বিষয়টি সব দল সমর্থন করলেও এর কাঠামো নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। একইভাবে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়েও মতবিরোধ দেখা যায়।
সংস্কার বাস্তবায়নে গণভোট আয়োজন করা হয়, যেখানে জনগণের মতামত নেওয়া হয়। গণভোটে বিভিন্ন প্রস্তাব অনুমোদন পেলেও রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। বিশেষ করে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত গণভোটে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় বিতর্ক তৈরি হয়।
পরবর্তীতে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করা হলে তা নিয়েও মতবিরোধ দেখা দেয়। কিছু রাজনৈতিক দল এই আদেশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। নির্বাচনের আগে ও পরে দলগুলোর অবস্থানেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।
সবশেষে বলা যায়, রাষ্ট্র সংস্কারের এই প্রক্রিয়ায় কিছু ক্ষেত্রে ঐকমত্য তৈরি হলেও গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। ফলে সংস্কারের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।